জমিয়তের বিএনপি জোট ত্যাগ : তারপর এবং অতঃপর
আব্দুল হালীম

[ওজরখাহি : রাজনীতির মাঠের মানুষ নই। নেপথ্যের কারিগরি পছন্দ করি। রাজনীতিটাকে বুঝি, দেওবন্দীয়াত ধারণ করি। বার্ডস আই দিয়ে দেখা জমিয়তের এই বিএনপির সঙ্গত্যাগ নিয়ে অবজার্বেশনটা শেয়ার করা দরকার বোধ করছি।]
গত বুধবার। জুলাই ১৪, ২০২১। দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০বছরের একটি রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতি ঘটলো। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ অফিসিয়াললি বিএনপি জোট ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। মূলত, বিএনপির সাথে জমিয়তের নীতি এবং আদর্শিক কোনো ঐকমত্য ছিলো না কখনোই। জোটটা হয়েছিলো- তৎকালীন আওয়ামী দুঃশাষণ থেকে জাতিকে উদ্ধারের একটি সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে। জমিয়তের সে পদক্ষেপ যে সঠিক ছিলো- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও সাময়িক জোটবদ্ধ নির্বাচনী অঙ্গিকার পুরণে বিএনপি কখনোই সদয় ছিলো না। একদিকে বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বশূণ্যতা, দলীয় কোন্দল, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বন্দীত্ব আর বিএনপি নেতৃত্বের অপরিনামদর্শী পদক্ষেপ বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদেরকে প্রতিনিয়ত অন্ধকারের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে…। (লেখাটি বিএনপিকে নিয়ে নয়, তাই বিষয়টি এখানেই শেষ) বেশ কিছুদিন থেকে জমিয়ত নেতৃত্ব এবং তৃণমূল এটা বুঝতে পারছিলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এখন শুধু একটি নাম। এর বাইরে কিছুই নয়। বরং এই মুহূর্তে বিএনপির সাথে থাকাটাই অপাংক্তেয় রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছাড়া কিছুই নয়। অবশেষে সেটাই হলো যা হওয়ার ছিলো… কিন্তু সময়টা ক্ষেপন হলো। এই সময় ক্ষেপনটার জন্য জমিয়ত নেতৃত্বকে দোষ দেয়া যাবে না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষপটটাই এভাবে ছিলো যে কোনোভাবে ছেড়ে আসা যাচ্ছিলো না। অবশেষে জমিয়ত নেতৃত্ব আবারও দূরদর্শীতার পরিচয় দিলেন… স্বাগত জানাচ্ছি!
প্রতিক্রিয়া :
বিএনপি সঙ্গ ত্যাগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের প্রতিক্রয়া আসবে;
১. বিএনপি ও বন্ধুভাবাপন্ন মানুষেরা : জমিয়তের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করবেন এবং সরকারের সাথে আঁতাত হওয়ার একটা ভূয়া দাবি তুলবেন। (যদিও বিএনপি এবং বন্ধুস্থানীয়রা আপাতত দাবি দাওয়া ছাড়া আর কিছু করবার যোগ্যতা রাখেন না) তাদের এই দাবি বা হুমকি-ধামকিকে গুরুত্ব দেয়াটা বোকামী বৈকি। সুতরাং দুদিন তাদেরকে বলতে দিন এমনিতে চুপসে যাবে যেটা বিগত ১৫ বছর থেকে দেখছি।
২. আওয়ামী সুবিধাভোগী তথাকথিত ফাত্তানগ্রুপ : এরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে এবং জমিয়ত নেতৃত্বের তুমূল সমালোচনা এমনকি ব্যক্তি আক্রমণ শুরু করবে। তাদের মনের ভেতরে একটা ভয় তৈরি হয়েছে- হায়রে এতদিন তো সরকারের সামনে নিজেদেরকে বিএনপি-জামায়াত বিরোধী বলে যে সুবিধাটা নিতাম- সেটা তো আর মনে হয় পারবো না। সুতরাং গালাগালী, তুহমত, ফোঁড়ন কাটা সহ বিভিন্ন ধরণের আজেবাজে কথা ছড়াতে শুরু করবে। বস্তুত এরা স্বমেহনের আনন্দটা ভোগ করবার চেষ্টাটা করবে শেষ বারের মতো- এইই! এরচে’ বেশি কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই। এবং মজার ব্যাপার সরকারের কাছে আসলেই এদের গুরুত্বটা শূণ্যের কোটায় চলে এসেছে।
৩. জমিয়তপ্রেমী মানুষেরা : জমিয়তের এই সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাবেন। জমিয়তকে মজবুত মেরুদণ্ডের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেশ-প্রেমে উদ্বুদ্ধ একটি কাফেলায় পরিণত করবার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবেন। কিন্তু কতটুকু পারবেন সেটাই দেখার বিষয়… বস্তুত কর্মপন্থা এবং নেতৃত্বের প্রতি শতভাগ আস্থা পোষণ না করলে দিল্লি বহুত দূর। সেটা হবে না- নেতৃত্ব সংকট আরো ঘণিভূত হবে এবং চরম রাজনৈতিক ক্রাইসিস দেখা দেবে।
পরামর্শ :
(জানিনা আমার এই লেখাটি জমিয়ত নেতৃত্ব পর্যন্ত যাবে কিনা- পরামর্শগুলো ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো)
- ১. দলকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।
- ২. দলীয়ভাবে সামাজিক সহায়তা ফাণ্ড গঠন করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দুস্থ-অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানো।
- ৩. ইসলামের জন্য, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, পতাকার জন্য, মানচিত্রের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করার মানসিক শক্তির জায়গাটা তৈরি করে ফেলতে হবে।
- ৪. তৃণমূলকে ঢেলে সাজানো। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেকটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রদান করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ।
- ৫. নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা ও নেতৃত্বের প্রতি বৈরিতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তিদেরকে দলের নাম ধরে সুবিধা নেয়ার পথ রুদ্ধ করা ছাড়া মেরুদণ্ড মজবুত করা সম্ভব নয়।
- ৬. জমিয়তের যারা রাজনীতি করবেন তাদের ফুল টাইম রাজনীতিতে আসা। পার্টটাইম রাজনীতি করে বর্তমান যামানায় ঠিকে থাকা সম্ভব নয়।
- ৭. দেশে-বিদেশে থাকা ইসলামী রাজনীতি বোদ্ধা মানুষদেরকে জমিয়তের প্রতি আন্তরিক করে তোলা এবং তাদেরকে নিয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্ঠা পরিষদ গঠন করাটা জরুরি। প্রতিনিয়ত ভূ-রাজনীতির পট পরিবর্তন হচ্ছে এই পরিবর্তনগুলো বোঝা জরুরি।
- ৮. আগামী ২০ বছরের একটি মেগা প্ল্যান গ্রহণ (যেমন: ২০৪০ সালে আমাদের ৫০জন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, ১০০ জন মেম্বার, ২০ জন উপজেলা চেয়ারম্যান, ৩০ জন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, ১০জন এমপি যে কোনো মূল্যে নির্বাচিত করতে হবে)।
- ৯. সমমনা মানুষের মধ্যকার দূরত্ব ঘুঁচিয়ে মাদানী কাফেলার প্রত্যক সদস্যকে জমিয়ত নামক বটবৃক্ষের ছায়ায় জড়ো করে ফেলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যে কোনো ধরণের ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
- ১০. সরকারে সাথে সম্পর্কটা (যেটি আবশ্যিকরূপে তৈরি হবে সেটা) যেন ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার না হয় সে ব্যাপারে নেতৃত্বকে কঠোর তত্ত্বাবধান করতে হবে। সবসময় জাতি, দেওবন্দীয়াত, দ্বীন-আখেরাত ইত্যাদিকে সামনে রেখে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং সম্পর্কের অবনমন হয় সে ব্যাপারে কড়া নজরদারি এবং প্রমিজ রক্ষা হওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে তাই হোক!
লেখক : আব্দুল হালীম- ইসলামি গবেষক, কলামিস্ট।
[বি.দ্র. : মুক্তকথন বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব, এর সাথে দৈনিক সময় সিলেট এর সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্কিত নয়। দৈনিক সময় সিলেট সকল মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে মুক্তকথনে প্রকাশিত লেখার দায় দৈনিক সময় সিলেট এর নয়।]




