সিলেট বিভাগের সড়কে চাঁদাবাজির মহোৎসব : প্রশাসন,পরিবহণ-সংশ্লিদের বাইরেও রয়েছে চাঁদাবাজ
সময় সংগ্রহ

সিলেট বিভাগের সড়কে চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। এ অপকর্মে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনের লোকজন ও পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা। আর চাঁদাবাজির সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। প্রশাসন বরাবরই চাঁদাবাজির বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে অভ্যস্ত। তবে পরিবহণ-সংশ্লিষ্টদের কৌশল ভিন্ন। ‘শ্রমিকের কল্যাণ’ বিষয়টি সামনে রেখেই চলছে তাদের অপকর্ম।
প্রশাসন, পরিবহণ-সংশ্লিদের বাইরেও রয়েছে নানা ধরনের চাঁদাবাজ। সব মিলিয়ে চাঁদাবাজদের কাছেই যেন অঘোষিতভাবে লিজ দেওয়া হয়েছে সিলেটের সব সড়ক। দাপটের সঙ্গে চাঁদাবাজি চলছে সিলেটের প্রবেশপথ হবিগঞ্জ থেকে বিভাগের শেষ প্রান্ত সুনামগঞ্জ পর্যন্ত। চাঁদার জন্য তারা নানা অজুহাতে মহাসড়ক, সড়ক, রাস্তা ও পয়েন্টের যেখানে-সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখে যানবাহন। ফলে শত পরিকল্পনার পরও পিছু ছাড়ছে না যানজটের যন্ত্রণা।
জানা যায়, সিলেটে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে ট্রাকে। পাথর কোয়ারি ছাড়াও স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পরিবহণগুলোই চাঁদাবাজদের প্রধান টার্গেট। চাঁদাবাজরা চাঁদা আদায় করলেও ভাগ দিতে হয় অনেককেই। কেন্দ্রের পরিবহণ নেতারাও বাদ যান না ঢাকায় থাকলেও। এমনকি এসব অনিয়ম তদারকি, নজরদারি যাদের দায়িত্ব, তারাও নিয়মিত ভাগ নেন। ফলে অনিয়মের যথাযথ মনিটরিংয়ের বদলে তারাও সেজে আছেন ঠুঁটো জগন্নাথ। এই ভাগবাঁটোয়ারায় ছন্দপতন ঘটলেই সিলেটের পরিবহণ খাত অস্থির হয়ে উঠে। ধর্মঘট ঝামেলা এড়িয়ে অস্থিরতা দমিয়ে রাখতে প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা চাঁদা বন্ধের ব্যাপারে কঠোর হতে আগ্রহী নন। সহনশীল মাত্রার চাঁদাবাজি বহাল রেখে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে যাওয়াতেই তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি সিলেটের ভোলাগঞ্জ। এই কোয়ারির পাথর পরিবহণকে ঘিরে রয়েছে বড় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। এমনকি সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে সরকারি রাজস্ব না দিলেও চাঁদা দিতেই হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক যায় এই মহাসড়ক দিয়ে। তাদের ঘাটে ঘাটে গুনতে হয় শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদা। শুধু ভোলাগঞ্জ থেকে সিলেট নগরীতে পৌঁছাতেই দিতে হয় চার দফা চাঁদা। শ্রমিক কল্যাণের নামে ২০ টাকা চাঁদার কথা বলা হলেও আদায় হয় ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে সিলেট জেলা ট্রাক-পিকআপ, কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদা আদায় চলছে অনেক আগে থেকেই। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তৈমুর নগর ভাংতি ব্রিজ, পাড়ুয়া ব্রিজের মাঝে, শ্রমিক ইউনিয়নের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে, পাড়ুয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে, সালুটিকরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে ও বিমানবন্দর বাইপাসে লাল পতাকা হাতে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলা হচ্ছে প্রতিদিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধুপাগুল এলাকার এক ট্রাক শ্রমিক জানান, এসব চাঁদার টাকা তিন ভাগ হয়। এক ভাগ পায় জেলা কমিটি, আরেক ভাগ পায় স্থানীয় আঞ্চলিক উপকমিটি ও যারা সারা দিন চাঁদার টাকা তোলেন, তারা পায় এক ভাগ। শ্রমিক ইউনিয়নের নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সাধারণ শ্রমিকরা তা পান না।
চাঁদা আদায়কারীরা জানান, সিলেট জেলা ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান ইউনিয়নের সভাপতি আবু সরকার ও সাধারণ সম্পাদক আমির উদ্দিনের নির্দেশে উপজেলাভিত্তিক আঞ্চলিক উপকমিটিগুলো এসব চাঁদা আদায় করছে।
চাঁদা আদায় নিয়ে পরিবহণ শ্রমিকদের অভ্যন্তরে দখল, দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রায়ই ঘটছে। সিলেটের বহুল আলোচিত আবু সরকারকে হটিয়ে বিরোধীরা কিছুদিন চাঁদাবাজি করলেও এখন ফের পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন আবু সরকার।
সিলেট জেলা ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান ইউনিয়নের সভাপতি আবু সরকার চাঁদা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জেলার সব আনলোড পয়েন্টেই চাঁদা আদায় হচ্ছে। তবে এই চাঁদা আমার জন্য নয়, শ্রমিকের কল্যাণের জন্যই আদায় হয়। আমার নির্দেশেও নয়, কেন্দ্রের নির্দেশেই আদায় হচ্ছে। ২০/৩০ টাকার চাঁদা আদায় করে তা দিয়ে আমরা শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। তার দাবি, ইতোমধ্যে ৫৮টি শ্রমিক পরিবারে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আরও ৪৩ পরিবারকে দেওয়া হবে শিগগিরই।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন বলেন, চাঁদাবাজি হচ্ছে না, এটা বলা যাবে না। তবে চাঁদাবাজির খবর পেলেই আমরা অভিযান করে তাদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। সম্প্রতি জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ সড়কে অভিযান চালিয়ে আবু সরকার ও আমির উদ্দিনের নামে বসানো চাঁদাবাজদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছি। পুলিশ ও ট্রাফিকের চাঁদাবাজির ব্যাপারে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের ব্যাপারে অভিযোগের প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পুলিশ, ট্রাফিক ও শ্রমিকদের চাঁদাবাজির ব্যাপারে কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ করতে চায় না।
এদিকে, মৌলভীবাজারে গাড়ি তল্লাশির নামে শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট ও উপজেলা থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করে ট্রাফিক পুলিশ। অনেক গাড়ির কাগজ থাকার পরও নানা অভিযোগ এনে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়। ট্রাফিক পুলিশের নেতৃত্বাধীন একটি টিম নম্বরবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে মাসোহারা আদায় করছে।
জেলা ট্রাফিক সার্জেন্ট মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বলেন, শোরুমের লোক সিন্ডিকেট করে এ টাকা আদায় করে। শোরুম টাকা আদায় করলে ট্রাফিক পুলিশ স্টিকার সংযুক্ত গাড়ি দেখলে ছেড়ে দেয় কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে অফিসে আসবেন বলে তিনি মোবাইল সংযোগ কেটে দেন।




