‘বিশ্বনেতারা শুধু বক্তব্য দিচ্ছেন, যুদ্ধ বন্ধে কিছুই করছেন না’
সময় সংগ্রহ

ওলগা স্তেফানশিয়ান, এমপি, ইউক্রেন পার্লামেন্ট : ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পূর্ণ সামরিক অভিযানের আজ ১৮ দিন। মাত্র দুদিনের মধ্যে আমাদের পুরো দেশ দখলে নিতে চেয়েছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। কিন্তু তিনি পারেননি। ইউক্রেনীয় বাহিনীর পাশাপাশি পুরো দেশ সাহসের সঙ্গে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের স্বাধীনতা ও মুক্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকরা রাশিয়া ও পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা কতটা সাহসী, দেশপ্রেমিক ও শক্তিশালী।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে প্রতিদিনই শত শত সেনা হারিয়েছে রুশ বাহিনী। তাদের অনেকেই আটক হয়েছে। তারা মানসিকভাবে এতটাই বিধ্বস্ত যে, এখন বলছে— তাদের কী উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে তারা তা জানত না। তাহলে কিভাবে তারা ইউক্রেনে পৌঁছে গেল, তারও নানা গল্প পরিবেশন করছে। কেউ বলছে— তারা সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এসেছিল। তারা মনে করেছিল, ইউক্রেনে ঢুকলে ইউক্রেনীয়রা তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেবে। তারা ভাবেনি যে, ফুলের বদলে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে তাজা বুলেট। এই বুলেট আমাদের স্বাধীনতার জন্য তাদের প্রত্যেককেই খতম করে দেবে।
পুতিনের ধারণা ছিল— রুশপন্থি অন্য দেশগুলোর মতো সহসাই ভেঙে পড়বে ইউক্রেন। কিন্তু না, নিজেদের দেশ রক্ষার লক্ষ্যে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত রুখে দাঁড়িয়েছে ইউক্রেনীয়রা। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে আমাদের সেনারা। ফলে গত কয়েক দিনের যুদ্ধে ভয়ানক পরাজয়ের মুখে পড়েছে রুশ বাহিনী। গত ১৮ দিনের যুদ্ধে তারা অন্তত ১৩ হাজার সেনা হারিয়েছে। এ ছাড়া হারিয়েছে ৫৭টি যুদ্ধবিমান, ৮৩টি হেলিকপ্টার, ৩৫৩টি ট্যাংক, ১১৬৫টি সামরিক যান, ১২৫টি আর্টিলারি ও ৫৮টি এমএলআরএস। এ ছাড়া ৩১টি বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, সাতটি ইউএভিএস, তিনটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়েছে। শুধু তাই নয়, অন্তত ৭০০ সেনাকে যুদ্ধবন্দি করা হয়েছে।
ইউক্রেন ও এর প্রধান প্রধান শহরগুলো দখলে নিতে ব্যর্থ হয়ে রুশ বাহিনী এখন তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে।
এখন তারা আকাশ থেকে শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের ওপর বোমা ফেলছে। বেসামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করছে। রাশিয়া ও বেলারুশ সীমান্ত থেকেও রকেট ও বোমা ছোড়া হচ্ছে যা আবাসাকি এলাকা, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি, বিমানবন্দর ও সেতু এবং জলাধার ধ্বংস করা হচ্ছে। এগুলো স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ।
ইউক্রেনের মানবিক পরিস্থিতি দ্রুতই খারাপের দিকে যাচ্ছে। খারকিভ, চেরনিহিভ, সুমি ও মারিউপোলের মতো শহরগুলোতে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন শত শত মানুষ হতাহত হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মারিউপোলের মাতৃসদন হাসপাতাল। গত ৯ মার্চ হাসপাতালটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রুশ বাহিনী। হামলায় এক শিশুসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়। সন্তানসম্ভবা নারী, চিকিৎসাকর্মী ও শিশুসহ আহত হয় আরও অন্তত ১৭ জন। শুধু মারিউপোলই রুশ হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
মারিউপোল ও আরও বেশ কয়েকটি শহর এখন প্রায় বিধ্বস্ত। সেখানে পানি নেই, নেই বিদ্যুৎও। প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে নেই হিটার। রুশ বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন গোলাবর্ষণের কারণে সেখানে কোনো ত্রাণ সহায়তাও পৌঁছাতে পারছে না। আবার অধিবাসীদের এলাকা থেকে বের হতেও দিচ্ছে না রুশ সেনারা। তাদের মানবঢাল হিসাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে সবার নজর অধিবাসীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেটাও বারবার লঙ্ঘন করছে রুশ বাহিনী।
ইউক্রেনের জন্য সেই সঙ্গে ইউরোপ এমনকি পুরো বিশ্বের জন্যই সবচেয়ে বড় হুমকির বিষয় হচ্ছে পরমাণু বিপর্যয়। চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ ও জাপরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ আগেই দখলে নিয়েছে রুশ সেনারা। কেউই উপলব্ধি করতে পারছে না, চেরনোবিলে এখন কী ঘটছে। পুরো অঞ্চল কতটা ঝুঁকিতে আছে। পারিস্থিতি খুবই বিপজ্জক। রাশিয়ার পরমাণু প্রতিরোধ বাহিনীও উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
এটা স্পষ্টতই রাশিয়ার ধূর্ত কৌশল। তারা শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বাধ্য করতে চায়। আর তাদের দাবিগুলো হচ্ছে— ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত হতে হবে, ইউক্রেনের কোনো সামরিক বাহিনী থাকতে পারবে না আর রাষ্ট্রভাষা হিসাবে রুশ চালু করা।
তাদের এই দাবিগুলো ইউক্রেন সরকারের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এতসব সত্ত্বেও ইউক্রেনীয়রা এখনো সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। দেশের ৯২ শতাংশ নাগরিকেরই বিশ্বাস, রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ যুদ্ধে তারাই জয়ী হবে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের মেয়ররা আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। ইউক্রেনের জনগণ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। রুশ বাহিনীর বুলেটের মুখেও তারা রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। খেরসন শহরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এতই বড় যে রুশ হানাদারদের পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী একটি বাহিনীর মোকাবেলা করছে আমাদের সেনাবাহিনী। এখন আমাদের যেটা একান্তই প্রয়োজন সেটা হচ্ছে— বিশ্ববাসীর সমর্থন। আমরা শুধু সহানুভূতি ও নৈতিক সমর্থন চাই না। আমাদের দরকার জরুরি ভিত্তিতে ইউক্রেনের আকাশকে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করা। সেই সঙ্গে প্রয়োজন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান। আমাদের আরও দরকার প্রকৃত মানবিক করিডোর যাতে আমাদের জনগণ নিরাপদে সরে যেতে পারে এবং অতি অবশ্যই দরকার, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হলে যুদ্ধ নিশ্চিতভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ ন্যাটোর পক্ষ থেকে এখনো নেওয়া হয়নি। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নেতারা আমাদের সমর্থন করে বক্তব্য ও বিবৃতি দিচ্ছেন। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধে তেমন কিছুই করছেন না। একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ভ্লাদিমির পুতিনের ভয়ে ইউক্রেনের লাখো কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দুর্ভাগ্যবশত, তারা উপলব্ধি করতে পারছে না ইউক্রেনীয় জনগণ আজ শুধু ইউক্রেনের মুক্তির জন্যই যুদ্ধ করছে না, তারা ইউরোপের জন্যও লড়াই করছে। হতে পারে তারা পুরো বিশ্বের জন্যই লড়ছে।




