এক মাসে ৫১ লাখ টাকা আদায়: আখাউড়া স্থলবন্দরে দর কষাকষি করে শুল্ক নির্ধারণ!
সময় সংগ্রহ

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে : অতিরিক্ত পণ্য বহন করায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে গত মার্চ মাসে ভারত থেকে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পণ্য আদায়ের কারণে ৫১ লাখ ৫১ হাজার টাকা শুল্ক আদায় করা হয়েছে, যা গত তিন মাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। তবে অভিযোগ রয়েছে, দর কষাকষি করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।
আর এতে করে সরকার বিপুল রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে নামমাত্র শুল্কে অতিরিক্ত পণ্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে কারবারিরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ঈদকে সামনে রেখে তৈরি পোশাক আনতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়— ফেব্রুয়ারি মাসে ১৪ লাখ ও জানুয়ারিতে মাত্র তিন লাখ টাকার শুল্ক আদায় করা হয়। এসব শুল্কের ৯০ ভাগের বেশি আদায় করা হয় ল্যাগেজে সুবিধার বাইরে আনা ‘জব্দ’ করা পোশাক থেকে। পণ্যবহনকারীদের বেশির ভাগই ভারতীয় নাগরিক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে— কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শুল্ক আদায়ে শুভংকরের ফাঁকি দিচ্ছে। প্রথমে এক ধরনের শুল্ক আদায়ের তাগাদা দেওয়া হলেও পরে বিশেষ সুবিধা পেয়ে সেটি কমিয়ে আনা হয়। এ অবস্থায় শুধুমাত্র শুল্ক আদায় করে এসব পণ্য ছেড়ে দেওয়ায় উৎসাহিত হচ্ছে এর সঙ্গে জড়িতরা। এতে আগামী ঈদে দেশীয় পোশাক শিল্প খাতে আঘাত আসতে পারে।
সরজমিনে ঘুরে আরো জানা গেছে— শুল্ক আদায়ের বাইরেও অনেক পণ্য এমনিতেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পণ্য আটকের পর ডিটেনশন মেমো (ডিএম) নামে যে কাগজটিতে জব্দ তালিকা তৈরি করা হয় সেটি যথাযথ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা নয়। নিজেরা এ ধরনের মেমো তৈরি করে তাতে সিল দিয়ে তালিকা তৈরি করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এছাড়া অনুমান নির্ভরতার কথা উল্লেখ করে নামমাত্র মূল্য দেখিয়ে এসব পণ্যের শুল্ক বসানো হচ্ছে। পরে আবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নতুন শুল্কের হিসেব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে— শুল্কের টাকা কমিয়ে বাড়তি সুবিধা নেন কাস্টমস সংশ্লিষ্টরা।
যাত্রীদের ব্যাগেজ সুবিধার আওতায় উল্লেখ আছে— বিদেশ ফেরত যাত্রী যুক্তিসঙ্গত পরিমাণে খাদ্যদ্রব্য, পরিধেয় গৃহস্থালী বা অন্যবিধ সামগ্রী ১৫ কেজি নিতে পারবেন। এর বেশি হলে তাকে নিয়ম অনুসারে শুল্ক সুবিধা দিতে হবে। এক বছরে তিনি তিনবার ৪০০ ডলার পর্যন্ত দামের পণ্য নিয়ে যেতে পারবেন।
অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনকারীদেরকে স্থানীয়ভাবে ‘লাগেজ পার্টি’ বলা হয়। তারা ওপার থেকে নিয়ে আসে। নিয়ে যায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এর সঙ্গে জড়িত দুই দেশের একাধিক চক্র। অন্তত ৫০ জন দম্পতি এভাবে পণ্য পরিবহনের কাজে জড়িত রয়েছেন বলে ধারণা পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। ম্যানেজ করা হয়েছে কাস্টমসের একাধিক অসাধু কর্মকর্তাকে। তবে এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে তৎপর থাকা একাধিক কর্মকর্তার জন্য সেভাবে তারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।
এদিকে, ভারতীয় পোশাক নিয়ে যাওয়ার সময় ২৪ মার্চ র্যাবের হাতের চার ভারতীয় নাগরিকসহ পাঁচজন র্যাবের হাতে আটক হয়। অথচ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে তাদেরকে ছাড় দিয়ে দিচ্ছে। নিয়ম অনুসারে কর্তৃপক্ষ এসব পণ্য জব্দ করারও এখতিয়ার রাখেন। গত ১৭ মার্চ কাপড় আটক হলে এ নিয়ে দিনভর ‘নাটক’ করে কাস্টমস। সাংবাদিকদের চাপের মুখে তারা সব পণ্যের বিপরীতে শুল্ক আদায় করতে বাধ্য হয়। এর আগে কিছু পণ্যের শুল্ক দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে— ভারত থেকে পণ্য আনার সঙ্গে জড়িতরা এখন শুল্ক দিয়েই নিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেননা, নামকাওয়াস্তে মূল্য ধরা হয় বলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আনার চেয়ে অনেক টাকা কম লাগছে। সংশ্লিষ্টদেরকে ম্যানেজ করেই এখন এ পথ বাতলে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আখাউড়া স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা শাহ মো. নোমান সিদ্দিকী বলেন— ‘আমাদের কাছে সরবরাহকৃত নির্ধারিত ডিএম মেমো না থাকায় নিজেরাই করে নিচ্ছি। এক্ষেত্রে পণ্য আটকের পর মেমোতে সিল দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে কারণে এ নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা না। আমরা নিয়মের বাইরে কেউ পণ্য আনলে সেগুলোর উপর শুল্ক বসিয়ে দিচ্ছি।’
এদিকে, বুধবার দুপুরে আখাউড়া স্থলবন্দরে হওয়া এক সভা শেষে ভারতের আগরতলা স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাকেশ কুমার চন্দ্রেশ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন— ‘এ ধরনের কোনো বিষয় আছে বলে আমার মনে হয় না। রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো কর নেই। তবে এক্ষেত্রে আমদানির বেলায় বাংলাদেশ কাস্টমস যদি মনে করে কর আদায় করবে সেটা করতে পারে।’
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ




