ছন্দে, গানে, আনন্দে শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস পালন
শ্রীমঙ্গল সংবাদদাতা :

শ্রীমঙ্গল সংবাদদাতা : সন্ধ্যা হতেই হাড় কাঁপানো শীতে কাপে সবাই। এমনই এক শীতের সন্ধ্যায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে মাস্ক ও শীতের কাপড় পড়ে শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনের মানুষরা ছুটে আসেন ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে। সন্ধ্যার সাথে সাথে অডিটোরিয়াম ভরে উঠে শ্রীমঙ্গল বাসীর পদচারনায়। ’৭১ এ এই দিন পাক হানাদার বাহিনীদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার আনন্দকে গত ৪৯ বছর ধরে উদযাপন করে আসছে শ্রীমঙ্গলবাসী। সন্ধ্যার পর থেকে জাগরণের গানে সবারই শীত শীত ভাব চলে যায়। গানের সুরে ও তালে সবাই মেতে উঠে মুক্ত দিবস উদযাপনে।
রোববার (৬ ডিসেম্বর) রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অডিটোরিয়ামে গিয়ে এমনটাই দেখা যায়। শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস উপলক্ষে সেখানে জাগরণের গান শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উদ্দীপ্ত তারুণ্য নামে একটি সংগঠন।
সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে মোমবাতি প্রজ্জ্বালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে জাতীয় সংগীত, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা, মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মুতিচারণ, জাগরণের গান (দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও নৃত্য) ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, মৌলভীবাজার সহকারি সিনিয়র পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিরাজ সেন তরুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহন সোম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অমলেন্দু পাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা নিহার রঞ্জন নাথ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন- লেখক ও ছড়াকার অধ্যাপক অবিনাশ আচার্য। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উদ্দীপ্ত তারুণ্যের মুখপাত্র সানজিতা শারমিন। সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন নাট্যবেদ নৃত্য নিকেতন, শ্রীমঙ্গল নৃত্যালয়, শ্রীমঙ্গল খেলাঘর আসর, শিকড় ব্যান্ড।
স্মতিচারনায় মুক্তিযোদ্ধারা বলেন- ১৯৭১ সালে নয় মাসের যুদ্ধ পরিক্রমায় ডিসেম্বর মাসে সারাদেশেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি বদলে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ, মিত্রবাহিনীর বৃহত্তর পরিসরে যুদ্ধ প্রস্তুতি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাকবাহিনী দিশেহারা হয়ে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। পাকিস্থানীরা মফস্বল শহরের রণাঙ্গন ছেড়ে রাজধানী অভিমুখে ছুটতে থাকে। এই সময়ে শ্রীমঙ্গলের পাক সৈন্যরা শ্রীমঙ্গল ছেড়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে যায়। যাবার সময় নানাভাবে বর্বরতার চিহ্ন এঁকে যায়। ৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল ভানুগাছ সড়ক দিয়ে মুক্তিফৌজ এসে শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করে। ট্রাক বোঝাই মুক্তিযোদ্ধারা মূর্হমূর্হ জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়ে শহরে প্রবেশ করে। জলপাই রং এর গাড়ীর বহরে শ্রীমঙ্গল শহর ছেয়ে যায়। ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমণী সংবাদ সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সবাই বাসাবাড়ীতে ফিরে আসে। সকলের চোখে আনন্দের বাধভাঙ্গা জোয়ার। মুক্তিফৌজ সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। জনসাধারন রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরে স্বাগতম অভিনন্দন জানাতে থাকে। এ আনন্দ উচ্ছ্বাসের কোন ভাষা নেই শুধু আনন্দাশ্রু বিসর্জন করা ছাড়া। স্বপ্নের স্বাধীনতা হাতের মুঠোয় এসে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা পৌরসভায় সমবেত হয়। পৌরসভা অফিসের সামনে সমবেত জয়বাংলার গগন বিদারী চিৎকারে মুখর করে তুলে। স্বাধীন, মুক্ত জন্মভূমিতে ফিরে এসে মুক্তিযোদ্ধারা কী করতে পারে ভেবে পাচ্ছিল না। যুদ্ধ ক্লান্ত দেহে শ্রান্তির আর কোন অবকাশ নেই। সব বর্ণময়, রঙ্গিন উৎফুল্ল মুখর। প্রকৃতির মধ্যেও আনন্দ চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখা যায়। মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও এ আনন্দ যজ্ঞে খুশীতে দিশেহারা। সমবেত মুক্তিযোদ্ধারা পৌরসভা অফিসের সামনে রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জয়বাংলা ধ্বনি দেয়।
উদ্দীপ্ত তারুণ্যের সমন্বয়ক শিমুল তরফদার বলেন- এই দিনটি শ্রীমঙ্গলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, ঐতিহাসিক দিন। আমরা এই দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গলমুক্ত দিবস উপলক্ষে জাগরণের গানের আয়োজন করে থাকি।




