গায়ে পুলিশের পোশাক, পিঠে বাঁধা অক্সিজেন সিলিন্ডার
সময় সংগ্রহ

পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বাঁধা পুলিশ সদস্য শফি আহমেদের ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। ছবি : সংগৃহীত
গায়ে পুলিশের পোশাক। পিঠে বাঁধা অক্সিজেন সিলিন্ডার। এই অবস্থায় মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন এক যুবক- এমন একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে।
ঘটনাটি সোমবারের। ছবিটি সিলেট শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল এলাকার। আর যে মোটরসাইকেল চালকের পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বাঁধা, তার নাম মো. শফি আহমেদ। সিলেট মহানগর পুলিশের নায়েক পদে চাকির করেন তিনি।
গত বছর করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই মানবিক সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসেন শফি আহমেদ। যা ইতোমধ্যে সিলেটজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। একবছরের বেশি সময় ধরে চলমান রয়েছে শফির এসব কর্মকাণ্ড। নিজের এসব কার্যক্রমকে বেগবান করতে আরও কিছু তরুণকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘মানবিক টিম’ নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে খাদ্য বিতরণ, প্লাজমা, অক্সিজেন সিলিন্ডার, অক্সিমিটার, ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণসহ নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবি সম্পর্কে মানবিক টিম’র প্রধান সমন্বয়ক শফি আহমদ মঙ্গলবার বলেন- সোমবার দুপুরে আমি নগরের শেখঘাট এলাকার একটি টিকাদান কেন্দ্রে ডিউটিতে ছিলাম। এমন সময় অচেনা নাম্বার থেকে দুটি ফোন আসে। জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রয়োজন। রোগী শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি।
শফি বলেন- একটু পরই আমার ডিউটি শেষ হয়। কিন্তু আমার মোটরসাইকেল তখন আরেকজন নিয়ে গেছে। আমার সাথেও কেউ নেই। আবার অপেক্ষা করলেও দেরি হয়ে যাবে। তাই আমি আরেকজনের মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় রাখা অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে হাসপাতালে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে শুনি রোগীকে শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি। হাসপাতালে শয্যা খালি নেই। পরে রোগীর স্বজনরা তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। এরপর আমি দুটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ওসমানীতে পৌঁছে দেই।
শামসুদ্দিন হাসপাতালের আশপাশ থেকে কেউ ছবি তুলে ফেসবুকে আপ করেন বলে জানান শফি। অক্সিজেন সিলিন্ডার দেওয়া দুই রোগীরই করোনার উপসর্গ রয়েছে। তবে তারা এখন অনেকটা সুস্থ আছেন বলেও জানান তিনি।
নিজের এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শফি বলেন- গত বছর ২৬ মার্চ থেকে আমরা এই সহায়তা কর্মসূচি শুরু করি। মূলত করোনা সংক্রমণের পর লকডাউনে বিপাকে পড়া দরিদ্র মানুষদের সহায়তার জন্যই এই উদ্যোগ নিয়েছিলাম। প্রথমে কেবল খাদ্য সহায়তা করতাম। এখন সহায়তার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। আরও অনেকে আমার সাথে যুক্ত হয়েছেন। দেশে ও প্রবাসের অনেকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন বলেও জানান শফি।
নিজেদের কাছে এখন ২৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ রয়েছে জানিয়ে শফি বলেন- ফোন পেলেই আমাদের মানবিক টিম-এর সদস্যরা অক্সিজেন সিলিন্ডার নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেন। কিন্তু মাত্র ২৫টি সিলিন্ডার নিয়ে সেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। অক্সিজেনের জন্য আমাদের কাছে প্রতিদিন শ’খানেক ফোন আসে।
বিভিন্ন জনের সহায়তার এই সিলিন্ডারগুলো সংগ্রহ করেছেন জানিয়ে শফি বলেন- অনেকে আমাদের টাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ অক্সিজেন সিলিন্ডার দান করেছেন। আমরা সেগুলো মানুষের প্রয়োজনে পৌঁছে দিচ্ছি।
অক্সিজেন সেবা ছাড়াও এখন রোগীর প্রয়োজনে প্লাজমা সংগ্রহ করে দিচ্ছে শফির ‘মানবিক টিম’। এ তথ্য জানিয়ে শফি বলেন- আজকেও আমরা দুইটা প্লাজমা সংগ্রহ করে দিয়েছি। এভাবে প্রতিদিনই একটা দুইটা প্লাজমা দিতে হয়। এছাড়া আমাদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিও অব্যাহত আছে। একেবারে দরিদ্র কিছু রোগীর জন্য ওষুধও সংগ্রহ করে দেই।
শফি জানান- দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, অসহায় হয়ে পড়া শিক্ষার্থী ও হতদরিদ্র মানুষদের সাহায্য শুরু করেন তিনি। কখনো চাল, ডাল, নুন, তেল দিয়ে। কখনো রান্না করা খাবার দিয়ে। আবার কখনো রক্ত এবং প্লাজমা সংগ্রহ করে দেন। আবার করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফনেও সহায়তা করে ‘মানবিক টিম’। তবে এখন অক্সিজেন সেবাই সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের মিডিয়া ও কমিউনিটি সার্ভিস বিভাগে কাজ করেন শফি। তার এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এই বিভাগের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন- পুলিশের কমিউনিটি সার্ভিসের কার্যক্রমেরই একটি অংশ স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে মানুষকে সহায়তা করা। আমাদের টিমের সদস্য হিসেবে শফি এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন- তার মানবিক কর্মকাণ্ড প্রশংসার দাবিদার। আমরা সবসময়ই তাকে উৎসাহ প্রদান করি। এসব কর্মকাণ্ড পুলিশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করে। তার পুলিশ সদস্যের বাইরে অনেক শিক্ষার্থীরাও স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছে। যা মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
পুলিশের এই এডিসি বলেন- মানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অফিসের কার্যক্রমে যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে এবং কারো সাথে কোনও বিরোধে না জড়ায় এই ব্যাপারেও শফিকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমার তার কার্যক্রম মনিটরিংও করছি।




