ফুঁসে উঠছে চালের বাজার : কঠোর মনিটরিং চান বিশেষজ্ঞরা
সময় সিলেট ডেস্ক

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বারবার লকডাউনে মানুষের একদিকে আয় কমেছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ছুটা কাজও নেই। এমন পরিস্থিতিতে দফায় দফায় ফুঁসে উঠছে চালের বাজার। মানুষের দুমুঠো খাওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন- পুরো চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন মূলত কয়েকজন মিল মালিক। তাদের ইচ্ছায় চালের দাম বাড়ে-কমে। এই সিন্ডিকেট যতদিনে না ভাঙবে, ততদিনে বাজার এভাবেই চলতে থাকবে। এর মধ্যে আবার মিল মালিকরাই যদি আমদানিকারক হন, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ অবস্থায় যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সব ব্যবসায়ীকে সমান শুল্ক কমানোর মাধ্যমে চাল আমদানি এবং সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর মনিটরিং হলে দাম কমার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে গতকাল দেখা গেছে- সরু চাল ও মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকায়। মাঝারি মানের মিনিকেট-নাজিরশাইল ৬২ থেকে ৬৫ টাকা, পাইজাম বা লতা বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকায়। মোটা চাল স্বর্ণা ও চায়না ইরি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। অথচ গত সপ্তাহেও মোটা চাল ৪৮ টাকায় পাওয়া যেত।
দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে খুচরা ব্যবসায়ীরা বরাবরই পাইকারি ও আড়তদারদের দায়ী করেন। এবারও তারা বললেন- পাইকারি ও আড়তে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে।
এদিকে বাজার মনিটরিং সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হালনাগাদ তথ্য বলছে- গতকাল শুক্রবার ভালোমানের নাজির-মিনিকেট কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৬০-৬৮ টাকা দরে, যা এক মাস আগে ছিল ৫৮-৬৫ টাকা। আর গত বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৫০-৬২ টাকা দরে। অর্থাৎ এক বছরে দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
এ ছাড়া মাঝারিমানের পাইজাম-লতা গতকাল বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৬ টাকা কেজি। এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৪৬-৫০ টাকা দরে। আর গেল বছরের একই সময়ে বিক্রি হয় ৪৪-৪৫ টাকায়। এক বছরে এই মানের চাল কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গতকাল মোটা স্বর্ণা, ইরি, চায়না চাল বিক্রি হয়েছে ৪৭-৫২ টাকা দরে। এক মাস আগে ছিল ৪৬-৫০ টাকা কেজি। গেল বছরের একই সময়ে বিক্রি হয় ৩৮-৪৮ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ এক বছরে গরিবের এই চালের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপ বলছে, করোনা মহামারীর এ সময়ের মধ্যে ২ কোটি ৪৫ লাখ লোক দরিদ্র হয়েছে। কমেছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা।
এমন পরিস্থিতিতেও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে, নানা ছলছুতায় মানুষের পকেট কাটছেন এবং অন্যায় মুনাফা লুটছেন। বর্তমানে তেমনি একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে চালের বাজারে। দেড় মাসের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা পর্যন্ত। বাজারে সবচেয়ে কম দামের যে মোটা চাল, যা মূলত গরিবের খাদ্য, তারও কেজিপ্রতি দাম হয়েছে ৫০ টাকা। আর একটু ভালোমানের এক কেজি সরু চাল কিনতে লাগছে ৭০ টাকারও বেশি।
খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার অবশ্য গণমাধ্যমকে জানান- চালের বাজার স্থিতিশীল করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারিভাবে চাল আমদানির প্রক্রিয়া চলমান। শিগগিরই এর সুফল দৃশ্যমান হবে। তিনি বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগে দেশে বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হতো শূন্য শতাংশ করারোপে এবং যে কেউ আমদানি করতে পারত। এর ফলে বাজারে আমদানিকৃত চালের সরবরাহ বেশি ছিল, ফলে দামও কমে যায়। এর ফলে কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল।
প্রান্তিক এসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে অন্য ফসলের চাষ শুরু করে। তাই কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করতে চাল আমদানিতে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ করারোপ করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল, কৃষককে ধান চাষে আবারও আগ্রহী করে তোলা এবং স্থানীয় সংগ্রহের মাধ্যমে খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি করা। বর্তমান সরকার এখন কৃষকের কাছ থেকে যৌক্তিক দামে ধান সংগ্রহ করায় কৃষকও উপকৃত হচ্ছে।’ খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চলমান বোরো সংগ্রহ অভিযানে ইতোমধ্যে সাড়ে আট লাখ টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। চাল সংগ্রহের সময় আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যেই শতভাগ চাল সংগ্রহ হয়ে যাবে।’
জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘মিলারদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে হবে। তা না হলে দিন দিন এমনই অবস্থার সৃষ্টি হবে। বড় কয়েকটি মিল মালিক পুরো চালের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এই নিয়ন্ত্রণকে সরকারের ভাঙতে হবে। জানি তারা অনেক শক্তিশালী, তাই বলে কি সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী?’ সাবেক এই দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমদানি শুল্ক কমালে সবার জন্য একই সুযোগ দিতে হবে। তাহলে সিন্ডিকেট ভাঙবে। মিল মালিকরাই যদি আমদানি করে তাহলে হঠাৎ হঠাৎ করে বাজার এমন অস্থিতিশীল হবেই। তাই মিলারদের চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সরকারের খাদ্যশস্যের মজুদ কমলে এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী এর সুযোগ নেয়। ইতোমধ্যে খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি ৫০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তাই সরকার চাচ্ছে দ্রুত চাল আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এ ছাড়া ওএমএসসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে মজুদ বাড়াতে বিদেশ থেকে ১০ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই আমদানিতে ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এর মধ্যে কাস্টম ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ হ্রাস করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এর পাশাপাশি বিদ্যমান রেগুলেটরি ডিউটি বা আবগারি শুল্ক ২৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যান্য আরও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশসহ মোট শুল্ক কমানো হয়েছে ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বর্তমানে সব মিলিয়ে ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্ক-কর প্রযোজ্য রয়েছে। ছাড়কৃত শুল্ক-কর বাদ দিলে চাল আমদানিতে ২৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ বহাল থাকবে। গত বৃহস্পতিবার এনবিআর এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। এ আদেশ আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আদেশে সিদ্ধ চাল ও ব্রোকেন রাইসের ক্ষেত্রে আরোপিত আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং সমুদয় রেগুলেটরি ডিউটি শর্ত সাপেক্ষে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর দেশে বোরোর বাম্পার ফলন হলেও অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সরকারের খাদ্যশস্যের মজুদ পরিস্থিতির ওপর। বোরো মৌসুমে এবার ৬ লাখ ৫০ হাজার টন ধান এবং ১০ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতি কেজি ধানের দাম ২৭ টাকা, সিদ্ধ ও আতপ চালের দাম যথাক্রমে ৪০ ও ৩৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল থেকে ধান ও ৭ এপ্রিল থেকে চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। গত সোমবার পর্যন্ত ৩ লাখ ৩০ হাজার ১৬৮ টন ধান, ৭ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ টন সিদ্ধ চাল ও ৬৩ হাজার ৬৫৫ টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনো ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮৩২ টন ধান ও ১ লাখ ৪১ হাজার ১৮৭ টন চাল সংগ্রহ হয়নি। অথচ চলতি আগস্টেই বোরো সংগ্রহ অভিযান শেষ হচ্ছে।
সংগ্রহ অভিযান সফল না হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সরকার ধান-চালের যে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে, তার চেয়ে বাজারে দাম বেশি। তাই কৃষক ও মিলাররা সরকারের গুদামে ধান-চাল সরবরাহে আগ্রহী নন। বর্তমানে সরকারের গুদামে সাড়ে ১২ লাখ টন চাল মজুদ আছে। দ্রুত চাল আমদানি করা হলে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হবে না। গত অর্থবছরে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছিল।




