টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখন ১৩ জনের বাংলাদেশ!
সময় সংগ্রহ

তারেক মাহমুদ, দুবাই থেকে : ৫১ বলে মাত্র ২০ রান দরকার তখন নিউজিল্যান্ডের। পড়েছে মাত্র ১ উইকেট। এরপর আর প্রেসবক্সে থাকার প্রয়োজন মনে করলেন না অনেক ভারতীয় সাংবাদিক। কারও ডেড লাইন শেষ, কারও হয়তো খেলা থেকেই মন উঠে গেছে। ল্যাপটপ গুটিয়ে আস্তে আস্তে হোটেলে ফেরার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন তাঁরা।
দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিও প্রায় ভাঙা হাট তখন। সন্ধ্যায় যে উৎসাহ–উদ্দীপনা নিয়ে ভারতের দর্শকেরা মাঠে এসেছিলেন, সেটি যেন হারিয়ে গেছে ভারতের ইনিংসটা ১১০ রানে থেমে যাওয়ার পরই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যেও প্রাণ ছিল না। পাকিস্তানের কাছে হারার পর নিউজিল্যান্ডের কাছেও ৩৩ বল বাকি থাকতে ৮ উইকেটে হেরেছে ভারত। আইপিএলের দেশের দল টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিটরা যে প্রথম দুই ম্যাচেই হেরে এমন চমক দেখাবে, সেটা কে জানত!
যেকোনো টুর্নামেন্ট শুরুর আগের অনেক হিসাব–নিকাশই আসলে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে থাকে। এমন নয় যে দুই ম্যাচ হারায় বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায় ঘটে গেছে। অঙ্কের হিসাবে সম্ভাবনা এখনো আছে। তবে এটা তো ঠিক, বিশ্বকাপের মতো আসরে ভারতের খারাপ খেলা মানে ক্রিকেটের বাজারেই মন্দা হাওয়া বইতে থাকা।
যেটা ঘটছে বাংলাদেশের বেলায়ও। আশার বেলুনে অনেক হাওয়া ভরে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এসেছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু সেই বেলুন চুপসে যেতে থাকে প্রথম পর্বের দুর্বল প্রতিপক্ষদের সামনেই। হাঁচড়ে পাঁচড়ে শেষ পর্যন্ত সুপার টুয়েলভে এলেও এখানেও থেকে হচ্ছে একের পর এক ধাক্কা। সুপার টুয়েলভে প্রথম তিন ম্যাচে হেরে কার্যত মাহমুদউল্লাহদের বিদায়ই ঘটে গেছে বিশ্বকাপ থেকে। পরের দুই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে হারানোটা দুরাশা। আর যদি কোনো দৈবচক্রে বাংলাদেশ এক–আধটা ম্যাচ জিতেও যায়, তবু সেমিফাইনালে যেতে মিলতে হবে অনেক হিসাব–নিকাশ।
এর মধ্যেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ–আকর্ষণ হারানোর আরেক কারণ ঘটে গেছে রবিবার। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে পরের দুই ম্যাচে খেলতে পারবেন না সাকিব। তিনি চলে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে। দেশে ফিরবেন পাকিস্তান সিরিজের আগে।
সাকিবের বিকল্প হিসেবে বিশ্বকাপের দলে নতুন কাউকেও ডাকা হবে না। ওদিকে উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান নুরুল হাসানও চোটে ভুগছেন। পরের ম্যাচেও তাঁর খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। চোট আক্রান্ত নুরুলসহই বিশ্বকাপে ১৫ জনের বাংলাদেশ দলটা এখন ১৪ জনের। একটু কি ভুল বলা হলো? দলটা এখন ১৪ জনের নাকি ১৩ জনের!
প্রশ্নটা এ কারণেই যে সাকিব দলে থাকা মানে একের ভেতর দুই, একসঙ্গে দুজন খেলোয়াড়কে দলে পাওয়া। একজন বাঁহাতি স্পিনার ও একজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। পরের দুই ম্যাচে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ তো দুই জায়গাতেই তাঁকে মিস করবেন!
দলের সঙ্গে থাকা নির্বাচক কমিটির সদস্য হাবিবুল বাশারের দুশ্চিন্তাটা এখানেই- ‘সাকিব দলে দুজন খেলোয়াড়ের কাজ করে। ও না থাকলে হয় একজন ব্যাটসম্যান কম খেলাতে হয় অথবা একজন বোলার কম খেলাতে হয়। সাকিবের খেলতে না পারা মানে দলটার একটা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া।’
তবে হাবিবুল এখন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না- ‘চোটের ওপর তো কারও হাত নেই। দলের সেরা খেলোয়াড়ও চোটে পড়তে পারে, সেটা মেনে নিয়েই খেলতে হবে।’
সাকিব, নুরুলের আগে চোটে পড়েছেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনও। বিশ্বকাপকে বিদায় বলে দেশেই ফিরে যেতে হয়েছে তাঁকে। দলের সঙ্গে রিজার্ভ খেলোয়াড় হিসেবে আসা রুবেল হোসনকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ঢোকানো হয় তখন। কিন্তু সাকিবের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর সে উপায়ও নেই। আরেক রিজার্ভ খেলোয়াড় লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলামকে যে আগেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে!
ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি সিরিজ জয়, তার আগে জিম্বাবুয়ে সফরেও সিরিজ জিতে আসায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে ভালো কিছুরই আশা ছিল। সেই আশার পালটা বেশি করে ওড়ানো হয়েছে দলের পক্ষ থেকেই। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সিরিজে যে ধরনের উইকেটে খেলা হয়েছে, তাতে এই দুই সিরিজ জয়ের অভিজ্ঞতা যে বিশ্বকাপে কোনো কাজেই আসবে না, সেই শঙ্কা তখন থেকেই ছিল। তবু রাসেল ডমিঙ্গো–মাহমুদউল্লাহদের আশা ছিল, বিশ্বকাপে কাজে লাগবে জয়ের অভ্যাস।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশ দলের হিসাবে গোলমাল মনে হচ্ছিল তখন থেকেই। ১৫ সদস্যের দলের সঙ্গে রিজার্ভ খেলোয়াড় হিসেবে নিয়ে আসা হলো পেসার রুবেল হোসেন ও লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলামকে। ম্যাচের দিন ড্রেসিংরুমে না এলেও জৈব সুরক্ষাবলয়ে থেকে দলের সঙ্গে অনুশীলন করছিলেন তাঁরা। এর মধ্যেই হঠাৎ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আমিনুলকে। সাকিব বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর খেলোয়াড়–সংকটের এটাই বড় কারণ। চোট–আঘাতে জর্জরিত দলটার আরও কেউ যদি পরের ম্যাচে চোটে পড়েন, তাহলে তো ৪ নভেম্বর গ্রুপে নিজেদের শেষ ম্যাচের একাদশ করাই কঠিন হবে!
করোনাকালের বিশ্বকাপে প্রায় সব দলই ১৫ জনের স্কোয়াডের বাইরে দু–তিনজন করে রিজার্ভ খেলোয়াড় রেখেছে সঙ্গে। মূল দলের অনেকে চোট–আঘাতে পড়ায় তাঁরা কাজেও লেগেছেন অনেক দলে। ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে দুজন রিজার্ভ খেলোয়াড় নিয়ে এসেও মাঝপথে একজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো দেশে।
হাবিবুল বাশার অবশ্য আমিনুলকে দেশে ফেরত পাঠানোর যুক্তি দিলেন- ‘আমিনুল এখানে থাকলেও খেলার সুযোগ পেত না, বসে থাকত। দেশে গিয়ে সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলবে। আমাদের লেগ স্পিনাররা বসে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। ওদের খেলা দরকার। আমিনুল প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলছে, সেটাই ভালো। আর এখন যেসব চোটে খেলোয়াড়েরা পড়ছে, এগুলো তো হঠাৎ করে হচ্ছে।’ দলে বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদ থাকায় সাকিবের অন্য বিকল্পেরও দরকার দেখছেন না তিনি, ‘দলে নাসুম আছে। যদি দ্বিতীয় স্পিনার খেলাতে হয়, তাহলে নাসুমই খেলবে।’
সেটা না হয় হলো। প্রশ্নটা তো তবু থেকেই যাচ্ছে। সাকিব ছিটকে যাওয়ায় দলটা এখন ১৪ জনের নাকি ১৩ জনের?




