মানবতা ও বিশ্বকে রক্ষার আহ্বান গ্লাসগো সম্মেলনে
আন্তর্জাতিক সময়

মানবতা ও বিশ্বরক্ষার আহ্বানের মধ্য দিয়ে স্কটল্যান্ডের রাজধানী গ্লাসগোতে গতকাল সোমবার (১ নভেম্বর) শুরু হয়েছে জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনের মূল অধিবেশন। এর আগে কপ-২৬ নামে পরিচিতি পাওয়া সম্মেলনটি গত রবিবার উদ্বোধন ঘোষণা করেন কপ-২৫ এর সভাপতি চিলির ক্যারোলিনা স্মিডিট।
এরপর কপ-২৬ এর সভাপতি অলোক শর্মার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ব্রিটিশ প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো, জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও প্রিন্স অব ওয়েলস চার্লস বক্তব্য রেখেছেন। আলজাজিরা, বিবিসি ও রয়টার্স।
উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন- কপ-২৬ সম্মেলনকে অবশ্যই মানবতা ও বিশ্বকে রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন- আমরা বর্তমানে আমাদের নিজেদের কবর খুঁড়ছি। তিনি বলেন- বিশ্বের উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে সম্পাদিত প্যারিস চুক্তি দেশগুলোকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতি কার্বনমুক্ত করা ও কয়লা পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন- বিশ্ব নেতাদের উচিত সম্মেলনকে সফল করার সর্বোচ্চ আকাক্সক্ষা পোষণ করা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন- মধ্যরাতের মাত্র এক মিনিট বাকি আছে। আমাদের এক্ষুনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রিন্স অব ওয়েলস বলেন- বিশ্বের আশা আপনাদের ওপর। তিনি এমন পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান, যা শিল্পের প্রত্যেক খাতকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করবে। তিনি বলেন- জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি আমাদের বর্তমানের জীবাশ্মনির্ভর অর্থনীতিকে সত্যিকারের নবায়নযোগ্য ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করছে।

জি-২০ সম্মেলনের মতোই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গ্লাসগোর সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না। অপর দিকে নিরাপত্তার কারণে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান গ্লাসগোতে অংশ নিলেন না। আগামী ১২ নভেম্বর সম্মেলন শেষ হবে।
অন্য দিকে রবিবার ইতালির রোমে বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর জি-২০ জোটের সম্মেলনে জলবায়ু রক্ষায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও এই বিষয়ে কোনো কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম সোলিহ প্রথম দিনের অধিবেশনে বক্তব্য দেন। সেখানে অর্থপূর্ণ এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন বিশ্বের ধনী দেশগুলোর নেতারা। তবে রোমে জি-২০ চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি কম থাকায় হতাশ হয়েছেন অ্যাক্টিভিস্টরা।
জি-২০ সম্মেলন আয়োজক দেশ ইতালির আশা ছিল গ্লাসগোতে কপ-২৬ সম্মেলনের আগে এই সম্মেলন থেকে জোরালো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। কপ-২৬ আয়োজক দেশ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন- পদক্ষেপ ছাড়া প্রতিশ্রুতি ‘ফাঁপা শোনাতে শুরু করেছে’। তিনি বলেন- ‘এসব প্রতিশ্রুতি দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা সমুদ্রে পড়ছে।’
সম্মেলনের পর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়- অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নেতারা একমত হয়েছেন যে বিশ্বের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ সেলসিয়াসে বাড়ার পরিবর্তে ১.৫ সেলসিয়াসে সীমিত থাকার প্রভাব অনেক কম হবে। এতে বলা হয়- ‘১.৫ সেলসিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে সব দেশেরই অর্থপূর্ণ ও কার্যকর পদক্ষেপ এবং প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।’

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- ‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার যা জোগানের সংযোগে বিঘ্ন’সহ আমাদের অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। আমাদের অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সহায়তায় এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ ও উপস্থাপনে আমরা একত্রে কাজ করবো।’
এদিকে সম্মেলনে বিশ্বনেতারা দরিদ্র দেশগুলোতে কয়লাভিত্তিক জ্বালানিকেন্দ্রে বিনিয়োগ বন্ধ করার বিষয়ে সম্মতি জানালেও নিজ নিজ দেশে তা বন্ধ করার বিষয়ে কোনো সময়রেখা নির্ধারণ করেননি। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস অবশ্য জি-২০ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের পরিবেশ সংরক্ষণে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকায় হতাশা জানিয়েছেন।
গত রবিবার এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন- ‘জি-২০ সম্মেলনে বৈশ্বিক সঙ্কট সমাধানে পুনরায় প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছি। আমার আশা পূরণ ছাড়াই রোম ত্যাগ করছি কিন্তু তার একেবারে কবর হয়নি। গ্লাসগোতে সিওপি২৬ সম্মেলনের লক্ষ্যে আমি তাকিয়ে আছি।’
১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জি-২০। বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের ৮০ শতাংশই আসে এসব দেশ ও জোটভুক্ত অঞ্চল থেকে। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাগি সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন- জি-২০-এর সব দেশই এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় এড়াতে এই লক্ষ্য অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বেশির ভাগ দেশই এর সাথে একমত। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দূষণকারী দেশ চীন ও রাশিয়া এই লক্ষ্য ২০৬০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। এমনকি এই সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই সম্মেলনে সরাসরি যোগ দেননি। ভিডিও লিংকে বক্তব্য রাখেন তারা।
যোগ দিলেন না এরদোগান : নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আঙ্কারার দাবি পূরণে ব্রিটেন ব্যর্থ হওয়ায় কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। সোমবার তুরস্কের দু’জন সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এরদোগানের সফর বাতিলের তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
ইতালির রাজধানী রোমে বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-২০ সম্মেলন শেষে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেয়ার কথা ছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের। কিন্তু তিনি গ্লাসগো সফরের পরিকল্পনা বাতিল করে দেশে ফিরেছেন বলে তুরস্কের সরকারি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর এক খবরে জানানো হয়েছে। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এরদোগানের দেশে অনির্ধারিত ফেরার বিষয়ে কোনো কারণ জানায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশটির একজন কর্মকর্তা বলেছেন- গ্লাসগোতে বৈঠকে প্রেসিডেন্টের অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি বিষয় ছিল। তুরস্কের আরেকজন কর্মকর্তা বলেছেন- প্রোটোকল ও নিরাপত্তার বিষয়ে তুরস্কের অনুরোধ রক্ষা করেনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। উচ্চপদস্থ ওই কর্মকর্তা বলেছেন- নিরাপত্তার জন্য গাড়ির সংখ্যা এবং অন্যান্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু দাবি পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।




