জগন্নাথপুরে ভোটের মাঠে ‘উড়ছে’ টাকা
জগন্নাথপুর সংবাদাতা

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রচারের শেষ দিকে এসে প্রার্থীরা টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এজন্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে বেছে নিয়েছেন তারা। অভিযোগে বলা হচ্ছে ভোটারদের ম্যানেজ করতে টাকা দিচ্ছেন অনেকে।
জগন্নাথপুর প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় ভোটের মাঠে টাকা উড়ানোর অভিযোগ অনেক পুরনো। এখানে নির্বাচন মানেই টাকা। কেউ টাকা উড়াচ্ছেন বেশি, আবার কেউ কম। টাকা ছাড়া নির্বাচন যেন ভাবাই যায় না এখানে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে টাকার খেলায় আরও বেশি মেতে উঠেছেন প্রার্থীরা। এখানকার লোকজনের কাছে ভোটের আগের রাতকে ‘ভাগ্য নির্ধারণী রাত’ বলা হয়। সেজন্য ভাগ্য নির্ধারণী রাতে সর্বত্র টাকা বিতরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
এবারের নির্বাচনে জগন্নাথপুরের সাতটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৩৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে ২১ জন প্রবাসী প্রার্থী রয়েছেন। অন্যসব প্রার্থীরা প্রবাসী পরিবারের।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, আগামীকাল রোববার জগন্নাথপুর উপজেলার সাতটি ইউপিতে ভোট-গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে কলকলিয়া, পাটলী, চিলাউড়া-হলদিপুর, রানীগঞ্জ, সৈয়দপুর-শাহারপাড়া, আশারকান্দি ও পাইলগাঁও। এসব ইউনিয়নে ৩৭ জন প্রার্থী ভোটে লড়ছেন। এছাড়া সাত ইউনিয়নে সংরক্ষিত পদে নারী প্রার্থী ৮৯ জন এবং সাধারণ সদস্য (মেম্বার) পদে ২৩৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
জানা যায়, নির্বাচনের শুরু থেকেই অর্থাৎ মনোনয়ন দাখিলের দিন থেকেই টাকাওয়ালা অধিকাংশ প্রার্থী টাকা উড়ানো শুরু করেছেন। মনোনয়ন দাখিলের এ দিন নির্বাচনী শো-ডাউনের পাশাপাশি প্রার্থীদের সঙ্গে মনোনয়ন দাখিলে আসা শ’’শ’ কর্মী সমর্থকদের জগন্নাথপুর শহরের হোটেল রেস্তোরাঁ থেকে বিরিয়ানি খাওয়ানোর ধুম পড়েছিল। রেস্তরাগুলোতে উপচে পড়া ভিড় ছিল সেদিন।
এদিকে প্রতীক বরাদ্দের পরপরই ভোট কিনার প্রতিযোগিতায় টাকার খেলা চলছে। এখেলা নির্বাচনের দিন ভোট প্রয়োগের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চলবে এমন ধারণা স্থানীয়দের। লোকজনের মুখে শুনা যাচ্ছে একেকটি ভোটের জন্য এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। এসব টাকা বিতরণের প্রমাণ করা খুবই কঠিন। টাকা ছড়াছড়ির অভিযোগ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে করছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা নাগরিক ফোরামের নেতা রুমানুল হক রুমেন বলেন, জগন্নাথপুরের প্রতিটি নির্বাচনেই টাকার প্রাধান্য থাকে। একজন প্রবাসী প্রার্থী কোটি টাকা নির্বাচনে ব্যয় করেন। আসন্ন নির্বাচনেও টাকা ছড়াছড়ির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলেও সঠিক প্রমাণের অভাবে সংশ্লিষ্টরা কোনো পদক্ষেপে নিতে পারছেন না।
জগন্নাথপুরের সাত ইউনিয়নে এবার ৩৭ চেয়ারম্যান প্রার্থী’র ২১ জনেই প্রবাসী। এর মধ্যে ১৯ জন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী, একজন ফ্রান্সপ্রবাসী এবং একজন ইতালিপ্রবাসী।
প্রার্থীরা হলেন কলকলিয়া ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী রফিক মিয়া, পাটলী ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সিরাজুল হক, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আব্দুল হাই, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এনামুল ইসলাম, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আতিকুর রহমান, চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আরশ মিয়া, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আব্দুল মোমিন, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ইলিয়াছ মিয়া, রানীগঞ্জ ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাবেক চেয়ারম্যান মজলুল হক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছালিক মিয়া ও ফ্রান্স প্রবাসী এম সিরাজুল ইসলাম আশিক, সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হাসান, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মকসুদ মিয়া কোরেশী, আজহারুল ইসলাম কামালি, মুকিতুর রহমান, ইতালিপ্রবাসী আসাদ হোসেন চৌধুরী, আশারকান্দি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আব্দুস সাত্তার, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জমিরুল হক, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মোহাম্মদ আলী খলকু, পাইলগাঁও ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মখলুছ মিয়া ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফারুক আহমদ। এছাড়াও অপর চেয়ারম্যান প্রার্থীরা প্রবাসী না হলেও তাঁদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা দেশে ফিরে প্রচারে আছেন।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রবাসী এসব প্রার্থীদের বেশিরভাগেই নির্বাচন মৌসুমে এসে প্রার্থী হন। ব্যতিক্রম ছাড়া বিজয়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কিছুদিন থেকেই ভারপ্রাপ্তদের দায়িত্ব দিয়ে প্রবাসে উড়াল দেন। পরাজিত হলে নির্বাচনের পরই পরই দেশ ছাড়েন।
উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী আলাল হোসেন রানা বলেন, আমার ইউনিয়নের অনেক প্রবাসী ভোটার রয়েছেন, তারা আমার পক্ষে বা অন্য প্রার্থীর প্রচারণায় এসে যোগদান করেন, সামাজিক নানা কাজেও তারা অংশ নেন। এজন্য প্রবাসী প্রার্থী নিয়ে বেশি কিছু বলাও যায় না, আবার সহ্যও করা যায় না, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বহু টাকা ব্যয় করেন তাঁরা, কিন্তু এই বিষয়ে প্রমাণ দেওয়া কঠিন হয়। আমরা যারা দেশে থেকে সমাজের কাজ করতে চাই, তাঁদেরকে নির্বাচন আসলে চাপের মধ্যে ফেলে দেন প্রবাসী প্রার্থীরা।
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, প্রবাসীর আমাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি প্রাকৃতিক এবং যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি সময় বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তবে নির্বাচনী মৌসুমে প্রবাসী প্রার্থীদের হিড়িক পড়ে। নির্বাচনে জয়ী হলে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করে ভারপ্রাপ্তের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে পরিবার ও ব্যবসা দেখতে দেশ ছাড়েন তারা, আর জয়ী না হতে পারলে পরের দিন প্রবাসে চলে যান। নির্বাচনে তাঁরা অঢেল অর্থ ব্যয় করছেন। এক্ষেত্রে আমরা অসহায়।
কলকলিয়া ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী রফিক আহমদ বলেন, সকল প্রবাসী প্রার্থী এক ধরণের নয়, আমি যদিও প্রবাসী, আমি নাড়ির টানে দেশের মানুষের সেবা করতে এসেছি, টাকা দেবার জন্য বা নেবার জন্য নয়, দেশে কোন রোজগারের ধান্দাও আমার নেই। এ ইউনিয়নে আমার পিতাও চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়ে ইউনিয়নবাসীর খেদমত করেছেন। আমি চাই মরহুম পিতার মতো মানুষের সেবা করতে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মুজিবুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমরা কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




