কুকুরগুলো তাঁকে আপন করে নিয়েছে
সময় সংগ্রহ

আজাদ রহমান, ঝিনাইদহ থেকে : মোহাম্মদ আলী যখন মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে যান, তখন তাঁর পেছনে থাকে কয়েকটি কুকুর। সকালে বাসা থেকে বের হতে দেরি হলে কুকুরগুলো দরজায় হাজির হয়। অনেক সময় তাঁর নিয়মিত বসার স্থানগুলোয় অপেক্ষায় থাকে কুকুরগুলো। তাঁর সঙ্গে এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেড়ায়। এসব দৃশ্য নিত্যদিনের। মোহাম্মদ আলী ভালোবেসে কুকুরগুলোকে খাবার দেন। আর কুকুরগুলোও তাঁকে আপন করে নিয়েছে।
মোহাম্মদ আলীর (৬৮) বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামে। নিজ গ্রামে চাপালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি অবসরে যান। স্ত্রী ও পাঁচ মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। অন্য তিনজন পড়ালেখা করছে। বর্তমানে তিনি নিজের খেতখামার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
ছোটবেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি টান রয়েছে মোহাম্মদ আলীর। বাড়িতে নানা প্রজাতির কবুতর, বিড়াল, কুকুর লালনপালন করতেন। এখানে–সেখানে অসহায় প্রাণীর মুখে খাবার তুলে দিতেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। কালীগঞ্জ শহরের নিমতলায় তাঁর দোকান ছিল। ১৯৯২ সালের দিকে ওই ব্যবসা ছেড়ে দেন। আগে দোকানের সামনে প্রায়ই অভুক্ত কুকুর এসে হাজির হতো। তিনি সেগুলোকে খাবার দিয়ে আনন্দ পেতেন। তার পর থেকেই রাস্তার ধারে কুকুর-বিড়াল পড়ে থাকতে দেখলে তিনি খাবার তুলে দেন।
মোহাম্মদ আলী বলেন- ‘কুকুরের খাবার দিতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০-৮০ টাকা খরচ হয়ে যায়। এখন চাকরি নেই। আর্থিক সংকটে মাঝে কিছুদিন খাবার দেওয়া বন্ধ করেছিলাম। কিন্তু অভুক্ত প্রাণীগুলো দেখলে মায়া লাগে। তাই আবার খাবার দেওয়া শুরু করেছি।’
বাড়ি থেকে দূরে কোথাও গেলেও কুকুরগুলোর খোঁজখবর রাখেন মোহাম্মদ আলী। তাঁর মেয়ে শ্যামলী খাতুন বলেন- ‘বাবা বরাবরই পশুপাখিভক্ত মানুষ। কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় গেলে সেখান থেকে বাড়িতে ফোন দিয়ে কুকুর-বিড়ালের খাবার দেওয়া হয়েছে কি না, খোঁজ নেন। আমাদের খোঁজ নেওয়ার আগে প্রাণীগুলোর খবর নেন তিনি।’
মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী কামরুন্নাহার বলেন- ‘সকালে দরজা খুলেই দেখি, দরজায় কয়েকটি কুকুর অপেক্ষা করছে। এটা দেখে মাঝেমধ্যে রাগ হয়। তবে সবার এমন ভক্ত পশু হয় না। যেটা আমার স্বামীর হয়েছে। এটা দেখে ভালোও লাগে। কখনো কখনো ফটক খুলি না। কিন্তু কুকুরগুলো যেভাবেই হোক, বাড়িতে ঢুকে পড়ে।’
চাপালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের দোকানি আবু জাফর বলেন- মোহাম্মদ আলীর জন্য তাঁর দোকানেও কয়েকটি কুকুর অপেক্ষা করে। সকালে তিনি চা খেতে এলে কুকুরগুলো তাঁকে ঘিরে ধরে। মোহাম্মদ আলী সেগুলোর মুখে খাবার তুলে দেন। প্রতিদিন বেশ কয়েকটি রুটি নিয়ে তিনি কুকুরকে খাওয়ান।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনন্দ কুমার অধিকারী বললেন, পশুগুলো ভালোবাসা ও খাবার পেলে যেকোনো মানুষের ভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ নিয়মিত খাবার দিয়ে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলে সখ্য হয়। এভাবেই তিনি (মোহাম্মদ আলী) প্রাণীগুলোকে আপন করে নিয়েছেন।
সৌজন্যে : প্রথম আলো




