ধর্ষণের ঘটনায় মমতার মন্তব্যে পশ্চিমবঙ্গে তোলপাড়
আন্তর্জাতিক সময়

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার হাঁসখালিতে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও পরে মৃত্যুর ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরূপ মন্তব্যে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। এ মন্তব্যের পর মমতার পদত্যাগ চেয়েছেন ২০১২ সালে দিল্লিতে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার নির্ভয়ার মা আশাদেবী।
নির্ভয়ার মা গতমঙ্গলবার বলেছেন— ‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নারী হয়েও এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিরূপ মন্তব্য করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকার অধিকার হারিয়েছেন তিনি। তাঁর ইস্তফা দেওয়া উচিত।’
৪ এপ্রিল নদীয়ার হাঁসখালির গাজনা গ্রামের এক কিশোরীর জন্মদিনে গিয়ে ওই গ্রামের সমরেন্দ্র গয়ালির পুত্র ব্রজ গয়ালি দলবল নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পরের দিন তার মৃত্যু হয়। ব্রজ গয়ালি ওরফে সোহেলের বাবা সমরেন্দ্র গয়ালি এলাকার তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও স্থানীয় পঞ্চায়েতের সদস্য।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রী বাস্তব ও বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার তদন্তভার তুলে দিয়েছেন সিবিআইয়ের হাতে। নির্দেশে বলা হয়েছে— আগামী ২ মের মধ্যে এই মামলার তদন্তের অগ্রিগতি নিয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে হবে হাইকোর্টে।
এলাকার শক্তিশালী নেতা হওয়ায় মৃত্যুর পরপরই ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া ওই কিশোরীর দেহ সৎকার করা হয়। এ ঘটনা যাতে প্রকাশ না পায়, সে জন্য ধর্ষণকারীর বাবা কিশোরীর পরিবারকে মামলা না করার হুমকি দেন। ফলে ঘটনার পর চার দিন কিশোরীর বাবা কোনো কথা না বললেও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চাইল্ড লাইনের সহযোগিতায় হাঁসখালি থানায় ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করেন। ঘটনার পর পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করলেও গা ঢাকা দেন ধর্ষণকারীর বাবা সমরেন্দ্র গয়ালি।
এ খবর রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন এলাকায় ওই ধর্ষণকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। এ দাবিতে হাঁসখালিতে ১২ ঘণ্টার বন্ধ পালন করেন স্থানীয় মানুষ। কলকাতা হাইকোর্টে এ নিয়ে মামলা করেন ৯ নারী আইনজীবীও। ধর্ষণের শিকার কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে ওই ঘটনায় সিবিআইয়ের তদন্তের দাবি জানানো হয়।
মঙ্গলবার মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট ধর্ষণের তদন্তভার অর্পণ করেন সিবিআইয়ের হাতে। আগামী ২ মে মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেন— ‘আপনি রেপ (ধর্ষণ) বলবেন, না কি প্রেগন্যান্ট বলবেন? আমি পুলিশকে বলেছি ঘটনা তদন্তের। শুনেছি, মেয়েটির নাকি লাভ অ্যাফেয়ার (প্রেমের সম্পর্ক) ছিল।’
মমতার এ কথায় রাজ্যের রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে। দাবি উঠেছে— অবিলম্বে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ ও তার মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত সব দোষীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে নেপথ্যের দোষী ব্যক্তিদেরও।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠলে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরী গত মঙ্গলবার ছুটে যান হাঁসখালিতে। কথা বলেন কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে। সেখানেই ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বাবা বলেছেন— একজন জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য আশা করা যায় না। অধীর চৌধুরী বলেছেন— এখন তো এ রাজ্যে শিল্প না থাকলেও খুনের আর হত্যার শিল্প আছে। এখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন— ‘উনি তো জঙ্গলরাজের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে ভয়াবহ। কীভাবে ওরা ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া ধর্ষণে মৃত ১৪ বছরের এক কিশোরীর দেহ সৎকার করল?’
আবার রাজ্যের বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন— ‘তদন্তের আগে কীভাবে মুখ্যমন্ত্রী নিদান দিলেন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে। এ তো দেশের আইনবিরুদ্ধ ঘটনা।’
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীও হাঁসখালির ওই কিশোরীর বাড়িতে গিয়ে বলেন— ‘এসব মন্তব্যের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর গলায় গামছা দিয়ে ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
এদিকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রী বাস্তব ও বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার তদন্তভার তুলে দিয়েছেন সিবিআইয়ের হাতে। নির্দেশে বলা হয়েছে— আগামী ২ মের মধ্যে এই মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে হবে হাইকোর্টে।
এ ছাড়া হাইকোর্ট এ রাজ্যের আরও চার ধর্ষণ মামলার তদন্তে আইপিএস অফিসার ও কলকাতা পুলিশের স্পেশাল কমিশনার দময়ন্তী সেনের নজরদারিতে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওই চারটি ধর্ষণ মামলা হয়েছে দেগঙ্গা, ইংরেজবাজার, মাটিয়া ও বাঁশদ্রোনিতে।




