ইউরোপে অভিবাসন: ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার শীর্ষে বাংলাদেশিরা!
সময় সংগ্রহ :

এম ওবায়দুর রহমান : উন্নত জীবনের আশায় নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিয়ে দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীরা। বিশ্বজুড়ে চলমান করোনাকালে এই প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে। একের পর এক নৌকা ডুবির ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়লেও থেমে নেই ভয়ঙ্কর পথে এ যাত্রা। ক’দিন পরপরই আন্তর্জাতিক মিডিয়া ভূমধ্যসাগর থেকে নৌকাডুবির ঘটনায় বাংলাদেশিদের উদ্ধারের খবর আসছে।
এবার লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে কমপক্ষে ১৭ জন বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যু খবর দিল তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট। এ দুর্ঘটনায় ৩৮০ জনের বেশি যাত্রীকে উদ্ধার করেছেন তিউনিশিয়ার কোস্টগার্ডের সদস্যরা। বুধবার (২২ জুলাই) রেড ক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
রেড ক্রিসেন্ট জানায়- লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের জুয়ারা থেকে সিরিয়া, মিসর, সুদান, মালি ও বাংলাদেশের অভিবাসীদের নিয়ে রওনা দেয় নৌকাটি। প্রায় চার’শ জন অভিবাসী যাত্রী লিবিয়ার জুয়ারা থেকে ইউরোপের পথে রওনা দিয়েছিলেন। যার মধ্যে নৌকাডুবে ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। আর উদ্ধার করা হয় ৩৮০জনকে। তবে মৃত ও উদ্ধার হওয়াদের নাম জানায়নি সংস্থাটি।
সাম্প্রতিক সময়ে তিউনিসিয়ার উপকূলে বেশ কয়েকটি নৌযানডুবির ঘটনা ঘটেছে। অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জীবিত উদ্ধারও করা হয়েছে অনেককে।
এর আগে গত ২৪ জুন ভূমধ্যসাগরে ভাসমান অবস্থা থেকে আড়াইশর বেশি বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। তিউনিসিয়া কোস্টগার্ড জানায়- তিন মিসরীয় নাগরিক এবং ২৬৪ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী একটি নৌকায় করে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইউরোপ যেতে চাচ্ছিলেন। মাঝসমুদ্রে নৌকাটি বিকল হয়ে গেলে বিপদে পড়েন তারা।
এর মাত্র তিনদিন পরেই সাগরে ভাসমান অবস্থায় ১৭৮ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী। উদ্ধার করা হয় দুটি মরদেহও। উদ্ধার ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ছিলেন বাংলাদেশি। অন্যরা ইরিত্রিয়া, মিসর, মালি ও আইভরি কোস্টের নাগরিক।
এছাড়া ৩ জুলাই লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে বাংলাদেশ, মিসর’সহ চারটি দেশের অন্তত ৪৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ও শরণার্থী নিয়ে ভূমধ্যসাগরে একটি নৌকা ডুবে যায়। নৌকার সকল আরোহীর মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এরপর গত ৮ জুলাই ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া আরেকটি নৌকা থেকে ৪৯ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার- ইউএনএইচসিআর জানায়- ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২১ লাখ মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন৷ এভাবে সাগরপথ পাড়ি দিতে গিয়ে এ সময়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন।
সংস্থাটি জানায়- চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যে সংখ্যক মানুষ অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা। দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন তিউনিশিয়ার অধিবাসীরা।
ইউএনএইচসিআর এর মতে- শুধু সমুদ্রপথ নয়, দুর্গম মরুপথ ও বনজঙ্গল পার হয়ে ইউরোপে যেতে গিয়ে অনেকে বন্দি হন, প্রাণও হারান। ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দফতর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী- ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন ইউরোপে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলেছে- চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কমপক্ষে এক হাজার ১৪৬ জন মারা গেছেন। আর ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টাকারী মানুষের সংখ্যা ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থাটি বলছে- চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মধ্য-ভূমধ্যসাগরে ‘লিবিয়া থেকে ইতালি’ যাওয়ার পথটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। এই পথে ডুবে মরেছে ৭৪১ জন। এরপর আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপের পথ ছিল দ্বিতীয় প্রাণঘাতী রুট। এই পথে মারা গেছেন কমপক্ষে ২৫০ জন। এছাড়া পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের স্পেনমুখী পথে মারা গেছেন কমপক্ষে ১৪৯ জন এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গ্রিসের পথে প্রাণ গেছে ৬ জনের।
আইওএম বলেছে- অনেক জাহাজ ভেঙে ডুবে যাওয়ায় এবং শনাক্ত করতে না পারায় ইউরোপগামী ভূমধ্যসাগরের পথে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
এদিকে, অবৈধভাবে প্রবেশ করা বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে না নিলে ভিসা বন্ধের হুমকিও দেয় ইউরোপ৷ পরে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ও ইইউ’র অভিবাসন বিষয়কমন্ত্রী ইউরোপ থেকে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের ফেরত আনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ফেরত আসা মানুষগুলোর জীবন যেন থমকে না যায়, সেজন্য দেশে ফেরত আসার পর তাদের পুনরেকত্রীকরণের উদ্যোগও নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আইওএম-এর সঙ্গে বাংলাদেশে সেই কাজটি এখন করছে ব্র্যাক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান প্রবাস জার্নালকে বলেন- চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যে সংখ্যক মানুষ অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা। তাদের সংখ্যা তিন হাজার ৩৩২ জন। এরপরই রয়েছেন তিউনিশিয়ানরা। তাদের সংখ্যা দুই হাজার ৯৬২ জন।
তিনি আরও বলেন- ২০১৪ সালে অবৈধভাবে সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যান দুই লাখ ২৫ হাজার ৪৫৫ মানুষ। তাদের মধ্যে মারা যান তিন হাজার ৫৩৮ জন। ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ পাড়ি দেন ১০ লাখ ৩২ হাজার ৪০৮ জন, মারা যান তিন ৭৭১ জন।
২০১৬ সালে তিন লাখ ৭৩ হাজার ৬৫২ জন, মারা যান পাঁচ হাজার ৯৬ জন। ২০১৭ সালে এক লাখ ৮৫ হাজার ১৩৯ জন পাড়ি দেন, পথে মারা যান তিন হাজার ১৩৯ জন। ২০১৮ সালে পাড়ি দেন এক লাখ ৪১ হাজার ৪৭২ জন, মারা যান দুই হাজার ২৭০ জন। ২০১৯ সালে এক লাখ ২৩ হাজার ৬৬৩ জন পাড়ি দেন, মারা যান এক হাজার৩৩৫ জন। ২০২০ সালে ৯৬ হাজার ৩১ জন অবৈধ পথে সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেও পথে মারা যান এক হাজার ৪০১ জন।
গত এক দশকে এভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় আটক হয়েছেন ৫৫ হাজার বাংলাদেশি। মানবপাচারের সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট এটি। ভূমধ্যসাগর দিয়েই ইউরোপে ঢুকতে হয়। গত সাত বছরে ২২ লাখ মানুষ অবৈধভাবে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
অনেকেই আবার অ্যাসাইলাম (আশ্রয়) চেয়েছেন উল্লেখ করে শরিফুল হাসান আরও বলেন- এ সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। দেড় থেকে দুই লাখ। যারা অবৈধভাবে ইউরোপ পাড়ি দেন তাদের অধিকাংশের বয়স ৩১ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এদের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ৷ এরপর আছেন ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা৷ তাদের সংখ্যা ২১ শতাংশ।
তিনি বলেন- সবাই কিন্তু বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন না। ফরিদপুর, সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষই বেশি যাচ্ছেন। যারা কিনা জেনে-শুনে-বুঝে অনেকেই পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করে যাচ্ছেন। দেশীয় চক্রের সঙ্গে মানবপাচারে জড়িত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিকভাবেই কঠোর ও জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছর ধরে ইতালিতে ইউরোপের অভিবাসীদের আগমনে নিম্নমূখি প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে তা আবার ঊর্ধ্বমূখি হচ্ছে। করোনা মহামারিতে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক মাসসমূহে তিউনিসিয়া ও লিবিয়া থেকে ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর জন্য অভিবাসন প্রত্যাশীদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নৌকাডুবি এবং হতাহতের ঘটনাও।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে ইউরোপের দিকে ছুটছে। এ যাত্রায় রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিও।




