বঙ্গবন্ধুর ‘আদর্শ ও দর্শন’ জয় করেছে বিশ্বনেতাদের মন
স্টাফ রিপোর্টার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটি বাংলাদেশের জাতির জনক বা স্থপতি এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক এই নেতা তার আদর্শ ও দর্শনের কারণে সারা বিশ্বের নেতাদের মনে স্থান দখল করে আছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালিকে বিশ্বের অনেক নেতাই দিয়েছে মুক্তিকামী মানুষের নেতাদের সর্বোচ্চ আসন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয়কে দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি ছিলেন হিমালয় সমান। সুতরাং হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি।
আর শ্রীলঙ্কার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদির গামা বঙ্গবন্ধুর স্থান দিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার আসনে। নৃশংস খুনের শিকার হওয়া শ্রীলঙ্কার এই নেতা বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তার স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশ ও জাতির নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের নেতা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের অগাধ ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা।
সময় সংবাদের পাঠকদের জন্য বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো বিশ্বনেতাদের আলোচিত বক্তব্যগুলো তুলে ধরা হলো।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ২০১৩ সালের ৪ মার্চ এবং ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি দুইবার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি মন্তব্য বইয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, ‘আই স্যালুট দ্য ব্রেভ লিডার অব অল টাইমস।’ একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মদাতাকে এভাবে হত্যা করায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, এই বাড়ি থেকে শেখ মুজিব বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে নেতৃত্ব দেন এবং এই বাড়িতেই তাকে হত্যা করা হয়।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মন্তব্য বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সম্মোহনী এবং অসীম সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে তার জনগণকে নেতৃত্বদান করেছিলেন। আমি একজন মহান দূরদর্শী এবং রাষ্ট্রনায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি যিনি স্বাধীন, উন্নত এবং গর্বিত বাংলাদেশের দৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মন্তব্য বইয়ে লিখেছেন, এই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন তার জন্য বড় সম্মান ও বিরল সুযোগ। বঙ্গবন্ধুকে বড় মাপের নেতা আখ্যা দিয়ে ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে ২০১৫ সালের ৬ জুন তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন তিনি। মোদির মূল্যায়ন হচ্ছে, একজন বড় মানবতাবাদী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সব মানুষের সমতা ও সুযোগের পক্ষে ছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চির অটুট বন্ধনে বঙ্গবন্ধুর যে লক্ষ্য ছিল, তা উপলব্ধি করার প্রতিশ্রুতি দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
জার্মানির সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ান উলফ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, ‘এ স্মৃতি জাদুঘর আমাদের একজন মহান রাষ্ট্রনায়ককে স্মরণ করিয়ে দেয়, যিনি তার জনগণের অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং অতিদ্রুত স্বাধীনতা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, তার ত্যাগ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করে যাবে। এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য পূরণের অংশীদার হতে পেরে শ্রীলঙ্কা গর্বিত। ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন তিনি।
দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে এসে লিখে গেছেন, এ এক গভীর মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা। এমন একজন মহৎ মানুষকে নিছক বুলেটবিদ্ধ করে হত্যা করা হলো। তবে তার অর্জনের স্মৃতি এ দেশে বেঁচে থাকবে। তার অনুসারী এবং কন্যা যেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উচ্চতায় বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন, এমন প্রত্যাশা রেখে গেছেন চন্দ্রিকা।
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে বলেন, ‘বাঙালির জোড়া উদযাপনে এই উন্নয়নচিত্রই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্মান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন নীতিনিষ্ঠ মানুষ। বাংলার মানুষের জন্য তিনি তার সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছেন, এই বাংলার ভাষা এবং তাদের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য।’
জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনে নেপালের প্রেসিডেন্ট বলেন, অনলবর্ষী বক্তা, সংগঠক ও যোদ্ধা হিসেবে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন এবং অর্জন করেছিলেন নতুন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য। এ অঞ্চলের মানুষের কাছেও তিনি পূজনীয় নেতা।
জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) মহাপরিচালক অড্রে অ্যাজুলাই বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পথ ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে৷ তার মতে, জাতির পিতার ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ সেই ভাষণে বৈশ্বিক মানবাধিকার ও মর্যাদার মূল্যবোধও প্রতিফলিত হয়েছে। ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স্থান পেয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ সফরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান৷ তারপর দর্শনার্থীদের বইয়ে তিনি লেখেন, বিদেশি শোষণের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে জনগণকে অভূতপূর্ব শান্তি সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পথ করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা জ্ঞাপন করছি।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় সের্গেই লাভরভ বলেন, অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করছে রাশিয়া, যিনি একজন লড়াকু নেতা হিসেবে জনগণের স্বাধীনতা ও সুখের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং রাশিয়ার সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন।
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, ‘দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। তিনি স্বাধীনতার জন্য প্রতিকূলতা ও বিরূপ পরিস্থিতি উপেক্ষা করে অটল সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন।’
সোনিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক এবং সমতার ভিত্তিতে মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে তার জনগণকে ক্ষমতাবান করতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। তার আত্মত্যাগ সবসময় সম্মানিত হবে, পরবর্তী প্রজন্ম এ আত্মত্যাগকে সম্মান করবে এবং এ সম্মান অব্যাহত থাকবে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় তার বাংলাদেশ সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের মন্তব্য বইয়ে লেখেন, এ উপ-মহাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি এবং জনক। বাংলাভাষাকে বিশ্বের মঞ্চে অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেই বিরল নেতা, যার প্রতি ধর্মমত নির্বিশেষে সব মানুষ প্রণাম জানিয়ে ধন্য হয়।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এক আলোচনায় ‘বঙ্গবন্ধু: বাংলাদেশের চেতনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী মানুষের লড়াইয়ের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং মন্তব্য করেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে স্মরণ করা হবে।
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ কারণেই মৃত্যুর ৪০ বছরের বেশি সময় পরও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো মন্তব্য বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবজাতির জন্য ছিলেন অনুপ্রেরণার বাতিঘর।




