সরকারি প্রতিবেদন ফাঁস: নেপালের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করছে চীন
আন্তর্জাতিক সময়

দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত সীমান্ত এলাকা পাড়ি দিয়ে নেপালের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করছে চীন। সেখানে দখলদারির চেষ্টা করছে তারা। নেপাল সরকারের ফাঁস হওয়া এক প্রতিবেদনের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
নিজেদের সীমান্ত এলাকায় চীনের অনুপ্রবেশ নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে নেপাল সরকারের প্রথম দাবি এটি। তবে কাঠমান্ডুতে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। আর এ ব্যাপারে নেপাল সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়ে এখন পর্যন্ত সাড়া না পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিবিসি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়- হুমলা জেলায় চীন অনুপ্রবেশ করছে বলে অভিযোগ ওঠার পর গত সেপ্টেম্বরে নেপাল সরকার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। তবে প্রতিবেদনটি এখনো কেন প্রকাশ করা হয়নি, তা সুস্পষ্ট নয়।
চীন ও নেপালের মধ্যে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ১৯৬০–এর দশকের শুরুর দিকে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ সীমান্ত এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এগুলোর বেশির ভাগই দুর্গম এলাকা। কয়েক কিলোমিটার পরপর শুধু কিছু স্তম্ভ বসিয়ে দুই দেশের সীমান্ত এলাকা আলাদা করা হয়েছে। আর সে কারণে ঠিক কোথায়, কার সীমান্ত এলাকা, তা জানা কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্ভাব্য চীনা অনুপ্রবেশের খবর পেয়ে হুমলায় একটি টাস্কফোর্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় নেপাল সরকার। পুলিশ ও সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে ওই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। কেউ কেউ তখন অভিযোগ করেছিল, সীমান্তে নেপালের অংশে চীন বেশ কিছু ভবন নির্মাণ করেছে। তবে, টাস্কফোর্স সদস্যরা বলেছেন- নেপালের অংশে মনে করা হলেও সত্যিকারে ভবনগুলো চীনা অংশেই নির্মিত হচ্ছে।
বিবিসিতে ফাঁস হওয়া ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- চীনা নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি কর্মকাণ্ডের কারণে নেপাল সীমান্তের লালুংজং এলাকায় ধর্মীয় কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৈলাস পর্বতের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটিতে পুণ্যার্থীদের জমায়েত হয়ে থাকে। হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই এটি একটি পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। নেপাল সরকারের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে- ওই এলাকায় নেপালের কৃষকদের চলাচল সীমিত করেছে চীন। একই এলাকায় সীমান্ত স্তম্ভ ঘিরে বেড়া নির্মাণ করছে। এ ছাড়া সীমান্তে নেপালের অংশে একটি খাল ও সড়ক নির্মাণেরও চেষ্টা করছে বেইজিং।
তদন্তকারীরা আরও দেখেছেন স্থানীয় নেপালিদের অনেকেই সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলতে আগ্রহী নয়। কারণ তাঁদের কেউ কেউ সীমান্ত অতিক্রম করে চীনা বাজারে যাওয়া আসার ওপর নির্ভরশীল।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ওই এলাকায় নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীকে মোতায়েন রাখার সুপারিশ করা হয়েছে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে। এ ধরনের সীমান্ত ইস্যুর সমাধানে চীন ও নেপালের মধ্যে বন্ধ থাকা প্রক্রিয়াটি নতুন করে সচল করা উচিত বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
নেপালের বিশিষ্ট মানচিত্রবিদ এবং জরিপ বিভাগের সাবেক প্রধান বুদ্ধি নারায়ণ শ্রেষ্ঠ বলেন- ‘সীমান্তের কাছে বসবাসকারী মানুষকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে নিজেদের সীমারেখা কতটুকু। তাহলে তারাই ভালোভাবে নেপালি ভূখণ্ডের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।’
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়- চীন নেপালের ভূখণ্ডে কোনোরকমের আগ্রাসনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। তবে নেপাল সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ক্ষেত্রে দেশটির কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা পরিষ্কার নয়। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি একটি কারণ হতে পারে।
চীন ও নেপাল সীমান্ত দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে পুণ্যার্থী ও ব্যবসায়ীসহ কিছু অনানুষ্ঠানিক যাতায়াত চালু ছিল। তবে চীন ক্রমাগতভাবে এ ধরনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
নেপালের সাবেক কূটনীতিক বিজয় কান্ত কর্ন বর্তমানে কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন- আঞ্চলিক শত্রু দেশ ভারতকে নিয়ে উদ্বিগ্ন চীন। বিজয় বলেন- ‘মনে হচ্ছে বহিরাগত শক্তির অনুপ্রবেশ নিয়ে তাঁরা চিন্তিত। সে কারণে তাঁরা সীমান্ত দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে চান।’
অন্য দেশে নিজেদের দেশের মানুষের পালিয়ে যাওয়া নিয়েও চীন উদ্বিগ্ন। নেপালের সীমান্ত এলাকায় চীনের তিব্বতের অবস্থান। কিন্তু চীনে নিপীড়িত হওয়ার অভিযোগ তুলে তিব্বতের অনেক বাসিন্দাই অন্য দেশে পালিয়ে যান। নেপালে বর্তমানে তিব্বতের প্রায় ২০ হাজার শরণার্থী রয়েছেন। তিব্বত থেকে অনেকে আবার ভারত কিংবা অন্য জায়গায়ও পালিয়ে গিয়ে থাকেন। গত কয়েক বছরে এসব পালানোর পথগুলো বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন।
নেপালের ভূখণ্ডে চীনের দখলদারি নিয়ে গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়ে আসছে। এ নিয়ে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে মাঝেমধ্যেই বিক্ষোভ হয়ে থাকে। সবশেষ বিক্ষোভ হয়েছে গত মাসে।
জবাবে গত জানুয়ারিতে নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাস একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়- ‘বিরোধের কোনো কারণই নেই। আশা করছি নেপালের জনগণ ভুয়া, এসব খবরে ভ্রান্ত হবেন না।’
এদিকে নেপাল সরকারের অপ্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট যে অভিযোগ করা হয়েছে, সে ব্যাপারে চীনা দূতাবাসের বক্তব্য জানতে চেয়ে সাড়া না পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিবিসি। ধারণা করা হচ্ছে নেপাল সরকার সীমান্ত ইস্যু নিয়ে চীনের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে জবাবে বেইজিং কী বলেছে, তা জানা যায়নি।




