কেমন আছেন নিম্নআয়ের খেটেখাওয়া মানুষেরা
সময় সংগ্রহ

সোহেল রানা, মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) থেকে : বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছেন সরকার। আবারো এক মাসের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৭ টাকা বেড়ে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের নতুন দাম ঠিক করা হয়েছে ২০৫ টাকা।
লাগামহীন নিত্যপণ্যের দামে ভারে পিষ্ট হচ্ছে মুক্তাগাছার নিম্নআয়ের মানুষ। নিম্ন-মধ্যবিত্ত’সহ সব শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন আয়ের তুলনায় ভারি হচ্ছে ব্যয়ের পাল্লা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মুক্তাগাছা উপজেলার দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মুক্তাগাছার নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষেরা।
এ অবস্থায় প্রতিদিনের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক’সহ সব নিম্নআয়ের মানুষ। অনেকেই আবার ভাঙতে শুরু করেছেন তাদের গচ্ছিত সঞ্চয়। এভাবে বেশি দিন চললে সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা তাদের।
মুক্তাগাছা পৌর বাজার’সহ ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজার ঘুরে জানা গেছে— ধানের ভরা মৌসুমেও চালের বাজার অস্থির। ২৫ ও ৫০ কেজি চালের প্রতি বস্তায় দাম বেড়েছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। অন্যদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে আটা, ডিম, মসলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও।
এক কেজি খোলা আটা কিনতে লাগে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, যা আগে ছিল ২৮ থেকে ৩২ টাকা। এক হালি ডিমের দাম ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা, বর্তমান মূল্য ৪০-৪৫ টাকা। ২৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজির রসুন হয়ে গেছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ১০ টাকা কেজির বড় আলু হয়ে গেছে ২৫ টাকা আর ১৪-১৫ টাকা কেজির আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। এ ছাড়াও বাজারে লাগামহীন দাম নিত্যপ্রয়োজনীয় শাক-সবজিরও।
শুধু তা-ই নয়, সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে কনফেকশনারি পণ্যের দামও। ৫ টাকায় বিক্রি হতো অলটাইম রুটি, এখন বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়, ১৫ টাকারটা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। ১০ টাকার কেক বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। এছাড়াও কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে সাবান ও কাপড় ধোয়ার পাউডারের।
৩৫ টাকার সাবানের দাম বেড়ে হয়েছে ৪৫ টাকা, ৫৫ টাকার ৫০০ গ্রাম হুইল পাউডারের দাম বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে। এভাবে প্রতিটি পণ্যেরই দাম বেড়েছে। হঠাৎই এমন দাম বাড়ায় অস্বস্তিতে পড়েছেন ক্রেতারা। বিক্রেতারা বলছেন— কোম্পানি দাম বাড়িয়ে দিলে তাদের তো কিছু করার নেই।
ষাটোর্ধ রিকশাচালক হেলাল মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন— বাজারে জিনিসপাতির দাম বাড়লেও আমাদের আয় তো বাড়েনি। ঈদের পর একটা গরু বিক্রি করে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিলাম। সংসারের খরচের তুলনায় আয় বাড়েনি। আর বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে সেই গচ্ছিত সঞ্চয় ভেঙে সংসারে খরচ চালাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের একসময় খেয়ে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়বে।
একই কথা বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক। তিনি বলেন— বাজারে হুটহাট জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও বেতন তো বাড়েনি। তাই বলে তো আর না খেয়ে থাকা যায় না। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ এবং সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে ব্যাংকের জমানো টাকা তুলে তুলে খরচ করছি।
দিনমজুর জগাই, নাজমা আক্তার, লিয়াকত আলী বলেন— মনেই পড়ে না কবে বাসায় মাছ-মাংস নিয়েছি। এখন আমরা ডালে-ভাতে বাঙালি হয়ে গেছি।
পৌর বাজারের ব্যবসায়ী আলম মিয়া, শেখ চান, জাকির হোসেন’সহ অনেকেই বলেন— পাইকারি বাজার’সহ কোম্পানিগুলোর বাজারদরের সঙ্গে খুচরা পর্যায়ের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা এবং কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে দিলে আমাদের তো কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই।
এছাড়াও বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পৌর শহরের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক, পাইকাশিমুলের জয়নাল আবেদীন, ঈশ্বর গ্রামের হেলাল উদ্দিন পাড়াটংগীর বাসিন্দা গোলাম জিলানী জনি কৃষক আবুল কাশেম, নিমাই ও মনির হোসেন।
সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গের মতে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটরিং অতীব জরুরি। বাজারে অনিয়মকারীদের শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি মজুতদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল মনসুর জানান— নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দর নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে, বেশি দামে পণ্য বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্যবসায়ী অবৈধ উপায় অবলম্বন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে উপজেলা প্রশাসন।
সূত্র : যুগান্তর




